তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ছায়া-newsedge4

ইউরোপে বিজয় দিবসের (ভিই ডে) ৮০তম বার্ষিকীর প্রাক্কালে গার্ডিয়ানের প্রকাশিত একটি জরিপ বিশ্বব্যাপী এক ভয়াবহ সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৪১ থেকে ৫৫ শতাংশ মানুষ বিশ্বাস করেন, আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ ‘খুব সম্ভব’ বা ‘মোটামুটি সম্ভব’। যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫ শতাংশ নাগরিকও এই আশঙ্কায় সহমত। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে রাশিয়ার সঙ্গে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা। এই জরিপ শুধু ভবিষ্যৎ যুদ্ধের আশঙ্কাই নয়, বর্তমান বিশ্বের ভঙ্গুর ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির একটি মূল্যায়নও প্রকাশ করে।

জরিপের ফলাফল থেকে জানা যায়, ৬৮ থেকে ৭৬ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, সম্ভাব্য তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহৃত হবে। এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চেয়েও ভয়াবহ প্রাণহানির কারণ হতে পারে বলে মনে করেন ৫৭ থেকে ৭৩ শতাংশ মানুষ। আরও উদ্বেগজনক হলো, ২৫ থেকে ৪৪ শতাংশ উত্তরদাতা আশঙ্কা করছেন, এই যুদ্ধ বিশ্বের বেশিরভাগ মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে পারে। পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার এবং এর সম্ভাব্য ব্যবহার বিশ্ব শান্তির জন্য একটি গুরুতর হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। রাশিয়ার সাম্প্রতিক পারমাণবিক নীতি সংশোধন, যেখানে প্রচলিত হুমকির বিরুদ্ধেও পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের প্রান্তিক কমানো হয়েছে, এই আশঙ্কাকে আরও তীব্র করেছে।

জরিপে রাশিয়াকে সম্ভাব্য যুদ্ধের প্রধান উসকানিদাতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পশ্চিম ইউরোপের ৭২ থেকে ৮২ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ৬৯ শতাংশ মানুষ রাশিয়াকে এই সম্ভাবনার কেন্দ্রে দেখছেন। ইউক্রেনে রাশিয়ার চলমান আগ্রাসন, পারমাণবিক হুমকি এবং ন্যাটোর সঙ্গে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এই ধারণাকে শক্তিশালী করেছে। তবে, আশ্চর্যজনকভাবে, ইউরোপের অনেক নাগরিক যুক্তরাষ্ট্রকেও শান্তির জন্য হুমকি হিসেবে দেখছেন। স্পেনের ৫৮ শতাংশ, জার্মানির ৫৫ শতাংশ এবং ফ্রান্সের ৫৩ শতাংশ মানুষ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা ইউরোপীয় শান্তির জন্য ‘গুরুত্বপূর্ণ’ বা ‘মাঝারি’ হুমকি। এটি ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ক্রমবর্ধমান অবিশ্বাসের ইঙ্গিত দেয়।

জরিপে আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো ইউরোপীয় দেশগুলোর নিজেদের সামরিক সক্ষমতার প্রতি আস্থার অভাব। ইতালির মাত্র ১৬ শতাংশ এবং ফ্রান্সের ৪৪ শতাংশ মানুষ বিশ্বাস করেন, তাদের সশস্ত্র বাহিনী দেশকে রক্ষা করতে সক্ষম। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ৭১ শতাংশ নাগরিক তাদের সেনাবাহিনীর ওপর আস্থা রাখেন। এই বৈষম্য ইউরোপের নিরাপত্তা কাঠামোর দুর্বলতা এবং ন্যাটোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার প্রতিফলন ঘটায়। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ন্যাটো সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়লেও, জনগণের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি একটি উদ্বেগের বিষয়।

জরিপে অংশ নেওয়া বেশিরভাগ মানুষ (৬৬ থেকে ৮৯ শতাংশ) মনে করেন, সম্ভাব্য তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে তাদের দেশ জড়িয়ে পড়বে। এই আশঙ্কার মধ্যেও একটি ইতিবাচক দিক হলো, উত্তরদাতারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঘটনাগুলোর শিক্ষাকে আজও প্রাসঙ্গিক মনে করেন। তারা বিশ্বাস করেন, তরুণ প্রজন্মকে এই ইতিহাস শেখানো অত্যন্ত জরুরি।

তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনা এড়াতে কূটনীতি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার কোনো বিকল্প নেই। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, তাইওয়ান প্রণালীতে চীনের সামরিক মহড়া, এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা বিশ্বকে একটি বিপজ্জনক সন্ধিক্ষণে নিয়ে এসেছে। জরিপে প্রকাশিত জনমত ইঙ্গিত দেয়, বিশ্ব নেতাদের অবশ্যই সংযম, সংলাপ এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। জাতিসংঘ, ন্যাটো এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ভূমিকা এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সম্প্রতি বলেছেন, “যুদ্ধ বন্ধ করতে তিনটি জিনিস প্রয়োজন: রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরও নিষেধাজ্ঞা, ইউক্রেনের জন্য অব্যাহত সমর্থন, এবং ইউরোপ জুড়ে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধি।” তাঁর এই বক্তব্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। একই সঙ্গে, পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি, যেমন স্টার্ট চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো এবং নতুন চুক্তির আলোচনা শুরু করা জরুরি।

তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা শুধু একটি জরিপের ফলাফল নয়, এটি বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান অস্থিরতার প্রতিফলন। রাশিয়ার আগ্রাসন, পারমাণবিক হুমকি এবং ইউরোপে নিরাপত্তা সংকট বিশ্বকে একটি সংকটময় মুহূর্তে দাঁড় করিয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য বিশ্ব নেতাদের অবশ্যই কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে প্রাধান্য দিতে হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শান্তি ও সহযোগিতার পথই মানবতার একমাত্র ভবিষ্যৎ। এই জরিপ আমাদের সতর্ক করে, কিন্তু সেই সঙ্গে শান্তির জন্য সম্মিলিত প্রচেষ্টার গুরুত্বও তুলে ধরে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *