ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় উপসাগরীয় অঞ্চলের আকাশরেখা আগুনে জ্বলছে। দুবাই, দোহা, মানামা, কুয়েত সিটি, আবু ধাবি ও রিয়াদসহ একাধিক শহরে বিস্ফোরণের শব্দে ভেঙেছে দীর্ঘদিনের স্থিতিশীলতার ভাবমূর্তি। সংযুক্ত আরব আমিরাতে অন্তত তিনজন নিহত, কাতারে ১৬ জন, কুয়েতে ৩২ জন, বাহরাইনে চারজন এবং ওমানে পাঁচজন আহত হয়েছেন। লক্ষ্য ছিল মার্কিন ঘাঁটি ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনা, কিন্তু আঘাত লেগেছে বিমানবন্দর, বন্দর, হোটেল, আবাসিক ভবন ও বেসামরিক অবকাঠামোয়—যা উপসাগরীয় দেশগুলোকে সরাসরি যুদ্ধের মুখোমুখি করে দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ শীর্ষ নেতৃত্ব নিহত হওয়ার পর তেহরানের এই পাল্টা হামলা এ অঞ্চলকে নতুন এক বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে। গত শনিবার থেকে শুরু হওয়া সংঘাতের তৃতীয় দিনে ইরান শত শত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছে—যার বেশিরভাগই জিসিসি দেশগুলোর আকাশপ্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আটকে দিলেও ধ্বংসাবশেষ ও কিছু সরাসরি আঘাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। দুবাইয়ের পাম জুমেইরাহ এলাকায় আগুন, আবু ধাবির জায়েদ বন্দরে ধোঁয়া, মানামায় আবাসিক ভবনে ক্ষতি—এসব দৃশ্য উপসাগরীয় দেশগুলোর ‘নিরাপদ আশ্রয়’ হিসেবে গড়ে তোলা ইমেজকে গভীরভাবে আঘাত করেছে।
জিসিসি দেশগুলোর সামনে এখন এক অস্বস্তিকর দ্বিধা। পাল্টা হামলা চালালে ইরানের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর অভিযোগ উঠবে, যা আঞ্চলিক ক্ষোভ বাড়াবে এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। অন্যদিকে নীরব থাকলে জনগণের নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ হবে এবং দুর্বলতার বার্তা যাবে। কাতারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হামাদ বিন জাসিম আল থানি সতর্ক করে বলেছেন, জিসিসি দেশগুলোকে ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে টেনে নেওয়ার চেষ্টা চলছে—যা উভয় পক্ষের ক্ষয়ক্ষতি বাড়াবে এবং বাইরের শক্তির হস্তক্ষেপের সুযোগ করে দেবে। দোহাভিত্তিক গালফ টাইমসের সম্পাদক ফয়সাল আল-মুদাহকা বলেন, এটি মূলত ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ—উপসাগরীয় দেশগুলো চায় উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও সংলাপ, যুদ্ধ নয়।
সংঘাত শুরুর আগে ওমান যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতা করছিল। ইরান পারমাণবিক সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বলেও দাবি উঠেছে। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় খামেনির মৃত্যু ঘটে, যা ইরানকে পাল্টা হামলায় উস্কে দেয়। এখন জিসিসি দেশগুলো ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিয়েছে—তারা ইরানের আগ্রাসনের নিন্দা করেছে এবং জাতিসংঘ সনদের ৫১ অনুচ্ছেদ অনুসারে আত্মরক্ষার অধিকার রাখে বলে ঘোষণা করেছে। পেনিনসুলা শিল্ড ফোর্সের মতো যৌথ সামরিক কাঠামো ব্যবহার করে ‘নিজস্ব সিদ্ধান্তে’ পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যাতে ইসরায়েলের পক্ষে সরাসরি অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ এড়ানো যায়।
সবচেয়ে বড় আশঙ্কা অবকাঠামো ঘিরে। বিদ্যুৎকেন্দ্র, পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্ট, তেল-গ্যাস স্থাপনায় হামলা হলে মরুভূমির এই দেশগুলো অচল হয়ে পড়বে। কাতারের এলএনজি সরবরাহ বন্ধ হলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে ধাক্কা লাগবে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বৈশ্বিক তেলের বড় অংশ যায়—অস্থিরতা মানেই দামের ঊর্ধ্বগতি।
উপসাগরীয় দেশগুলো এখনো সরাসরি যুদ্ধে নামেনি। তাদের অগ্রাধিকার নিজেদের ভূখণ্ড, জনগণ ও অর্থনীতি রক্ষা। কিন্তু আকাশে যখন ক্ষেপণাস্ত্রের আগুন জ্বলছে, তখন নিরপেক্ষতার সুযোগ কতদিন থাকবে—সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যে নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে—প্রক্সি যুদ্ধের যুগ শেষ হয়ে রাষ্ট্র বনাম রাষ্ট্রের সরাসরি লড়াইয়ের দিকে এগোচ্ছে। উপসাগর যদি ঐক্যবদ্ধ থাকে, তাহলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব; নইলে আগুন আরও ছড়িয়ে পড়বে।










































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































