বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক সংকটময় মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, বিনিয়োগের সংকোচন এবং রাজস্ব আয়ের স্বল্পতার কারণে প্রবৃদ্ধির হার ধীরগতির দিকে নেমে এসেছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুসারে, প্রবৃদ্ধি ৩.৯ শতাংশের আশেপাশে নেমে যেতে পারে। LDC গ্র্যাজুয়েশনের (২০২৬ সালের নভেম্বর) আগে এই ভঙ্গুরতা শুধু স্বল্পমেয়াদি চ্যালেঞ্জ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়নের জন্য বড় হুমকি।
অর্থনীতির এই ভঙ্গুরতার মূল কারণগুলো স্পষ্ট: গার্মেন্টস খাতের ওপর অত্যধিক নির্ভরশীলতা, জ্বালানি খাতের ভর্তুকি বোঝা, উইলফুল ডিফল্টারদের কারণে ব্যাংকিং খাতের NPL বৃদ্ধি, নিম্ন রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত (প্রায় ৭ শতাংশের কাছাকাছি) এবং বেসরকারি বিনিয়োগের পতন। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ব্যবসায়ী আস্থা কমে যাওয়ায় কারখানা বন্ধ, বিনিয়োগ হ্রাস এবং বেকারত্ব বেড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি তো আছেই—বন্যা, ঘূর্ণিঝড় এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি কৃষি ও অবকাঠামোকে নিয়মিত ক্ষতিগ্রস্ত করে।
টেকসই উন্নয়নের করনীয়?
- ম্যাক্রোইকোনমিক স্থিতিশীলতা: ম্যাক্রোইকোনমিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা জরুরি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সুরক্ষা এবং আর্থিক খাতের সংস্কার ছাড়া কোনো অগ্রগতি সম্ভব নয়। ব্যাংকিং সেক্টরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, খেলাপি ঋণ আদায় এবং স্বচ্ছতা বাড়ানো অপরিহার্য।
- বৈচিত্র্যকরণ: গার্মেন্টসের পাশাপাশি আইটি, ফার্মাসিউটিক্যালস, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণ, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ই-কমার্সের মতো খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। LDC গ্র্যাজুয়েশনের পর ট্রেড প্রেফারেন্স হারানোর ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়া দরকার।
- মানবসম্পদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বৃদ্ধি: শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন, নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ অর্থনীতির আধুনিকায়ন ছাড়া টেকসই উন্নয়ন অসম্ভব। দারিদ্র্য হ্রাস এবং বৈষম্য কমানোর পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করতে হবে।
- জলবায়ু সহনশীলতা ও সবুজ অর্থনীতি: নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পরিবেশবান্ধব শিল্প এবং অভিযোজন প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়িয়ে জলবায়ু ঝুঁকিকে সুযোগে রূপান্তর করা যেতে পারে। আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিলের সদ্ব্যবহার করা জরুরি।
- প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার: সুশাসন, দুর্নীতি দমন, স্বচ্ছতা এবং নীতির ধারাবাহিকতা ছাড়া কোনো সংস্কার টেকসই হবে না। বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করতে ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নত করা এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য স্থিতিশীলতা জরুরি।
বাংলাদেশের জনগণের অদম্য স্পৃহা ও শ্রমশক্তি এর আগেও অনেক সংকট মোকাবিলা করেছে। বর্তমান সরকারসহ সব অংশীজন যদি স্বল্পমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের ভারসাম্য রক্ষা করে এগোয়, তাহলে ভঙ্গুর অর্থনীতিকে টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জলবায়ু-সহনশীল পথে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। সময় আর অপেক্ষা করবে না—এখনই সাহসী পদক্ষেপ নেওয়ার মুহূর্ত।





































