বৃটেন আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিচ্ছে, তা মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের সংঘাতের মধ্যে একটি আশার আলো। বালফোর ঘোষণার ১০৮ বছর পর এবং ইসরাইল রাষ্ট্র সৃষ্টির ৭৭ বছর পরে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা শুধু ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে স্বীকার করে না, বরং দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনাকে জীবিত রাখার প্রচেষ্টা।
এই ঘোষণার সঙ্গে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং পর্তুগালের স্বীকৃতি যোগ হওয়ায় আন্তর্জাতিক মঞ্চে ফিলিস্তিনের অবস্থান আরও মজবুত হয়েছে, যা গাজা যুদ্ধ এবং পশ্চিম তীরের দখলদারিত্বের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়।
বৃটেনের এই অবস্থান পরিবর্তন কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। জুলাই মাসে তারা ঘোষণা করেছিল যে, পুরোনো নীতি থেকে সরে আসছে, যেখানে ‘সবচেয়ে প্রভাবশালী মুহূর্তে’ স্বীকৃতি দেওয়ার কথা ছিল। শর্ত ছিল—ইসরাইলকে গাজায় গণহত্যা বন্ধ করতে হবে, শান্তি প্রক্রিয়ায় অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে এবং ত্রাণ প্রবেশের সুযোগ দিতে হবে। কিন্তু বাস্তবে গাজার পরিস্থিতি আরও বিপর্যয়কর হয়েছে।
ইসরাইলি সেনারা নগরী ধ্বংস করে দখলের চেষ্টা চালাচ্ছে, ক্ষুধার্ত জনগণকে অনাহারে রাখছে এবং পশ্চিম তীরে প্রতিদিন অভিযান চালিয়ে বসতি স্থাপনকারীদের হামলা অব্যাহত রাখছে। ইসরাইলের উগ্রপন্থী নেতৃত্ব পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ধারণাকে ‘দাফন’ করার চেষ্টা করছে। এমন পরিপ্রেক্ষিতে বৃটেনের স্বীকৃতি দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের পক্ষে একটি শক্তিশালী বার্তা, যা আন্তর্জাতিক চাপ বাড়িয়ে ইসরাইলকে শান্তির পথে আনতে সাহায্য করবে।
আন্তর্জাতিক মঞ্চে এই ঢেউ চলছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনের ঠিক আগে এই ঘোষণা এসেছে, যেখানে ইসরাইলের দখলদারিত্ব এবং বর্ণবৈষম্য বড় আলোচ্য বিষয়। ফ্রান্স এবং সৌদি আরবের যৌথ সম্মেলনও দ্বিরাষ্ট্র সমাধান অগ্রসর করার লক্ষ্যে আয়োজিত।
বৃটিশ নেতাদের বক্তব্যে স্পষ্ট যে, হামাসের ভূমিকা ভবিষ্যতের ফিলিস্তিনে থাকবে না, এবং সিনিয়র নেতাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়েভেট কুপারের কথায়, এটি ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে স্বীকার করে। ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ল্যামির সতর্কতা যে, এটি রাতারাতি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা নয়, বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত করে।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া আশাব্যঞ্জক। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারসেন আঘাবেকিয়ান শাহিন বলেছেন, এটি ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন রাষ্ট্রের আশা জাগায় এবং ইসরাইলের দখলদারিত্বকে অস্বীকার করে। বৃটেনের সংসদে প্রথম ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত প্রতিনিধি লায়লা মোরানের কথায়, এটি দশকের অবিচারের সংশোধন, যদিও গণহত্যার পর এসেছে।
আরও পড়ুন: গাজায় ইসরায়েলি হামলাকে ‘গণহত্যা’ ঘোষণা জাতিসংঘের
অন্যদিকে, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এটিকে হামাসের ‘পুরস্কার’ বলে বিরোধিতা করেছেন এবং পশ্চিম তীরে কোনো ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র হবে না বলে দাবি করেছেন। উগ্রপন্থী মন্ত্রীদের দাবি যে, ইসরাইলের ভূমি শুধু ইহুদিদের, তা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং শান্তির পথে বাধা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরোধিতা সত্ত্বেও, এই স্বীকৃতি ইসরাইলের উপর চাপ বাড়াবে।
এই ঘোষণা ফিলিস্তিন-ইসরাইল সংঘাতের সমাধানের দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বাংলাদেশসহ বিশ্বের দেশগুলোকে এই পথ অনুসরণ করে ফিলিস্তিনের অধিকার সমর্থন করতে হবে। গাজায় গণহত্যা এবং পশ্চিম তীরের দখলদারিত্ব বন্ধ না হলে দ্বিরাষ্ট্র সমাধান কখনো বাস্তবায়িত হবে না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও সক্রিয় হয়ে ইসরাইলকে জবাবদিহি করতে বাধ্য করতে হবে, যাতে মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি ফিরে আসে।





































