ইসলামাবাদে ২১ ঘণ্টার ম্যারাথন বৈঠক শেষে কোনো চুক্তি ছাড়াই ফিরে গেছেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা। ১৯৭৯ সালে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর দুই দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের এই প্রথম সরাসরি আলোচনা এভাবে ফলহীন হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে একটি বড় ধাক্কা লেগেছে। যে আশা নিয়ে বিশ্ব তাকিয়ে ছিল, সেই আশাই এখন অনিশ্চয়তার গভীর ছায়ায় ঢেকে গেছে।
এই বৈঠকে শুধু মুখোমুখি কথাবার্তা হয়নি, বারবার কারিগরি নথি বিনিময় ও পর্যালোচনা হয়েছে। তবু শেষ পর্যন্ত দুই পক্ষের অবস্থানের মধ্যে যে দূরত্ব ছিল, তা পূরণ করা সম্ভব হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত ও সুনির্দিষ্ট সমাধান চেয়েছে, যেখানে ইরান অভ্যস্ত দীর্ঘমেয়াদি, ধীরগতির ও কৌশলগত আলোচনায়। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তারা ‘চূড়ান্ত প্রস্তাব’ দিয়েছেন—এখন বলার পালা ইরানের। অন্যদিকে ইরান বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের ‘অতিরিক্ত ও অযৌক্তিক’ দাবির কারণেই আলোচনা ভেস্তে গেছে। মূল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইউরেনিয়াম শোধন ইস্যু।
ইরান বারবার দাবি করেছে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায় না, শুধু শান্তিপূর্ণ জ্বালানি কর্মসূচি চালাতে চায়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরেনিয়াম শোধনের মাত্রা বৃদ্ধি পশ্চিমা বিশ্বকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। গত বছর ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের সংঘাতের অন্যতম কারণও ছিল এটি। যুক্তরাষ্ট্র চায় স্পষ্ট, অপরিবর্তনীয় প্রতিশ্রুতি যে ইরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। ইরান কিন্তু এখনো তার শোধন কার্যক্রম থেকে সরে আসতে রাজি নয়। এই অবিশ্বাসের দেয়ালই সংলাপকে ব্যর্থ করে দিয়েছে।
আলোচনাকালে ইরানের গণমাধ্যমে যে বার্তা প্রচারিত হয়েছে, তা স্পষ্টতই দেশের অভ্যন্তরীণ জনগণের উদ্দেশ্যে। কূটনীতিকে ‘দেশ রক্ষাকারীদের পবিত্র সংগ্রামের ধারাবাহিকতা’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। এতে বোঝা যায়, তেহরান অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ ও জাতীয় গর্বের বিষয়টিকে অগ্রাহ্য করতে পারছে না।
এর আগে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ট্রাম্পের কঠোর হুমকির ফসল ছিল। ইরানের অবকাঠামো ধ্বংসের যে হুমকি দিয়েছিলেন তিনি, সেটি এখন আবার বাস্তবায়িত হবে কি না—তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বর্তমানে দুটি প্রশ্ন সবচেয়ে জরুরি: আলোচনা থেকে সরে আসার পর ইরান কোন পথ বেছে নেবে? এবং এই অচলাবস্থা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে আর কতদিন অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখবে?
এই সংকটের গভীরতা কোথায়?
পারমাণবিক ইস্যু শুধু দ্বিপাক্ষিক নয়, এটি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার প্রশ্ন। ইরান যদি আরও কঠোর অবস্থান নেয়, তাহলে নতুন করে নিষেধাজ্ঞা, সামরিক উত্তেজনা ও তেলের বাজারে অস্থিরতা অনিবার্য। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র যদি ধৈর্য হারিয়ে একতরফা পদক্ষেপ নেয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্য আবার আগুনে পুড়বে।
এখন সময় এসেছে উভয় পক্ষের জন্য গঠনমূলক পুনর্বিবেচনার। ইরানকে বুঝতে হবে যে, বিশ্বাসযোগ্যতা না থাকলে কোনো শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিই আন্তর্জাতিক সমর্থন পাবে না। আর যুক্তরাষ্ট্রকে মনে রাখতে হবে যে, শুধু চাপ প্রয়োগ করে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়। কূটনীতির দরজা একেবারে বন্ধ করে দেওয়া উচিত নয়।
ইসলামাবাদের এই ব্যর্থতা শুধু একটি আলোচনার ব্যর্থতা নয়, এটি বিশ্বকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে, পারমাণবিক যুগে অবিশ্বাস ও কঠোর অবস্থান কতটা বিপজ্জনক হতে পারে। এখনো সময় আছে—যদি উভয় পক্ষ সত্যিকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখায়, তাহলে এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসা অসম্ভব নয়। অন্যথায়, অনিশ্চয়তা ও উত্তেজনাই হবে ভবিষ্যতের একমাত্র নিয়তি।





































