সকালেই কি বেশি হয় হার্ট অ্যাটাক?

বিশ্বজুড়ে হৃদ্‌রোগ এখন মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। বাংলাদেশেও বাড়ছে হার্ট অ্যাটাক এর ঝুঁকি ও আক্রান্তের সংখ্যা। চিকিৎসকদের দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণ বলছে, দিনের অন্য সময়ের তুলনায় ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত হার্ট অ্যাটাকের ঘটনা বেশি দেখা যায়।

প্রশ্ন হলো—এটি কি শুধুই কাকতালীয়, নাকি এর পেছনে রয়েছে বৈজ্ঞানিক কারণ? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিষয়টি কেবল ধারণা নয়; মানবদেহের স্বাভাবিক জৈবিক পরিবর্তনের সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

হৃদ্‌রোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের শরীর একটি নির্দিষ্ট জৈবঘড়ি বা সার্কাডিয়ান রিদম অনুসরণ করে চলে। রাতের ঘুম শেষে ভোরবেলায় শরীরে বিভিন্ন হরমোনের মাত্রা পরিবর্তিত হতে শুরু করে। বিশেষ করে অ্যাড্রেনালিন ও কর্টিসল হরমোনের নিঃসরণ বৃদ্ধি পায়, যা শরীরকে দিনের কাজের জন্য প্রস্তুত করে।

এই পরিবর্তনের ফলে হৃদস্পন্দন কিছুটা বেড়ে যায় এবং রক্তচাপও স্বাভাবিকের তুলনায় দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে। একই সঙ্গে রক্তের জমাট বাঁধার প্রবণতাও কিছুটা বাড়ে। যদি কোনো ব্যক্তির ধমনিতে আগে থেকেই চর্বি জমে সংকোচন তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে এই সময় রক্তপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। আর সেখান থেকেই হার্ট অ্যাটাকের সূত্রপাত হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভোর থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত সময়কে অনেক ক্ষেত্রে হৃদ্‌রোগজনিত জটিলতার ঝুঁকিপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ সময় ঘুম থেকে ওঠা, দৈনন্দিন কাজ শুরু করা কিংবা হঠাৎ শারীরিক পরিশ্রমের কারণে হৃদ্‌যন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে হার্ট অ্যাটাক শুধুমাত্র সকালেই হয়। দিনের যেকোনো সময়, এমনকি গভীর রাতেও হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। কিন্তু পরিসংখ্যানগতভাবে সকালবেলায় আক্রান্ত হওয়ার হার তুলনামূলক বেশি বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।

চিকিৎসকরা আরও জানান, যাদের উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল, স্থূলতা বা ধূমপানের অভ্যাস রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি। এছাড়া মানসিক চাপ, অনিয়মিত জীবনযাপন এবং পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।

বাংলাদেশে হৃদ্‌রোগ এখন জনস্বাস্থ্যের বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। নগরায়ণ, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়ার কারণে তুলনামূলক কম বয়সীদের মধ্যেও হার্ট অ্যাটাকের ঘটনা বাড়ছে বলে চিকিৎসকরা সতর্ক করছেন।

মূল তথ্য এক নজরে

  • ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত সময়ে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
  • সকালে অ্যাড্রেনালিন ও কর্টিসল হরমোনের মাত্রা বৃদ্ধি পায়।
  • ঘুম থেকে ওঠার পর রক্তচাপ ও হৃদস্পন্দন দ্রুত বাড়তে পারে।
  • রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা সকালের দিকে কিছুটা বৃদ্ধি পায়।
  • উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ধূমপান ও স্থূলতা ঝুঁকি বাড়ায়।
  • হার্ট অ্যাটাক দিনের যেকোনো সময় হতে পারে, তবে সকালকে তুলনামূলক ঝুঁকিপূর্ণ ধরা হয়।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, হার্ট অ্যাটাক প্রতিরোধে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সুষম খাদ্য গ্রহণ, ধূমপান পরিহার, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত ব্যায়ামের বিকল্প নেই। পাশাপাশি বুকে চাপ অনুভব করা, শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত ঘাম বা হঠাৎ দুর্বলতার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।

সকালে হার্ট অ্যাটাক বেশি হওয়ার বিষয়টি তাই নিছক গুজব বা কাকতালীয় ঘটনা নয়; এর পেছনে রয়েছে মানবদেহের স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া। সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ঝুঁকির কারণগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে হৃদ্‌রোগজনিত মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

1 comment on “সকালেই কি বেশি হয় হার্ট অ্যাটাক?”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *