রক্ত পরীক্ষা-newsedge24

ক্যানসার রিপোর্ট’ মেডিক্যাল জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় ভারতের বিখ্যাত অনকোলজিস্ট ও রোবটিক সার্জন ডা. রাজ নগরকর এবং তাঁর দল একটি অভূতপূর্ব রক্ত পরীক্ষা পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন, যা একাধিক ধরনের ক্যানসার প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করতে সক্ষম। এই পদ্ধতি, যাকে ‘মাল্টি-ক্যানসার আর্লি ডিটেকশন’ (MCED) নাম দেওয়া হয়েছে, ৬,৪৪৫ জনের উপর পরীক্ষা করে ৯৮.৪% নির্ভুল ফলাফল দিয়েছে। এর মধ্যে ২,৮০০ জনের ক্ষেত্রে ক্যানসার প্রথম পর্যায়েই শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে, যা চিকিৎসা শুরুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

ডা. নগরকর জানিয়েছেন, এই পদ্ধতিতে রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে তা হাই-রেজোলিউশন মাস স্পেকট্রোমেট্রি (HRMS) দিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় প্রাপ্ত ডেটা ‘ক্যানসার ডিটেকশন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ (CDAI) নামক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-চালিত অ্যালগরিদম দিয়ে পরীক্ষা করা হয়। এই অ্যালগরিদম রক্তে উপস্থিত বিভিন্ন মেটাবোলাইট বা রাসায়নিক কণার ধরন ও প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করে ক্যানসারের উপস্থিতি, ধরন এবং এর বিস্তার নির্ভুলভাবে চিহ্নিত করে। প্রতিটি ক্যানসারের নির্দিষ্ট মেটাবোলাইট প্যাটার্ন ভিন্ন হওয়ায় এই পদ্ধতি স্তন, কোলন, প্রস্টেট, ফুসফুস, জরায়ুমুখসহ বিভিন্ন ক্যানসার শনাক্ত করতে সক্ষম।

বর্তমানে ক্যানসার শনাক্তকরণে বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়, যেমন স্তন ক্যানসারের জন্য ম্যামোগ্রাফি, কোলন ক্যানসারের জন্য কোলনোস্কোপি, প্রস্টেট ক্যানসারের জন্য প্রস্টেট স্পেসিফিক অ্যান্টিজেন (PSA) রক্ত পরীক্ষা, এবং ফুসফুস ক্যানসারের জন্য স্বল্পমাত্রিক সিটি স্ক্যান। এই পদ্ধতিগুলো প্রতিটি নির্দিষ্ট ক্যানসারের জন্য আলাদা এবং সময়সাপেক্ষ। MCED পদ্ধতি একটি একক রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে একাধিক ক্যানসার শনাক্ত করতে পারে, যা সময় সাশ্রয় করে এবং দ্রুত চিকিৎসা শুরুর সুযোগ করে দেয়।

এই গবেষণা ভারতের স্বাস্থ্যসেবা খাতে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ডা. নগরকরের মতে, ক্যানসার প্রথম থেকে তৃতীয় পর্যায় পর্যন্ত নিরাময়যোগ্য। তাই যত তাড়াতাড়ি রোগ শনাক্ত করা যায়, রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা তত বেশি বাড়ে। এই পদ্ধতি ব্যবহার করে ইতিমধ্যে শনাক্ত হওয়া রোগীদের ক্যানসারের ধরন ও বিস্তার অনুযায়ী চিকিৎসা শুরু করা হয়েছে।

এই প্রযুক্তি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং অত্যাধুনিক প্রোটিওমিক্সের সমন্বয়ে কাজ করে। হাই-রেজোলিউশন মাস স্পেকট্রোমেট্রি রক্তে ১০,০০০-এর বেশি মেটাবোলাইট বিশ্লেষণ করতে পারে, যা ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্ত করতে সহায়ক। এই পদ্ধতি ঐতিহ্যবাহী ctDNA-ভিত্তিক পরীক্ষার তুলনায় আরও সঠিক এবং ব্যাপক।

তবে, এই প্রযুক্তির ব্যাপক প্রয়োগের ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। পরীক্ষার ব্যয়, ল্যাব সুবিধার প্রাপ্যতা, এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর উপর এর কার্যকারিতা যাচাইয়ের জন্য আরও গবেষণার প্রয়োজন। এছাড়া, এই ধরনের অত্যাধুনিক প্রযুক্তির প্রশিক্ষিত কর্মী এবং অবকাঠামোর প্রয়োজন, যা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।

এই আবিষ্কার ক্যানসার চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। বাংলাদেশে এই প্রযুক্তি প্রয়োগ করা গেলে সাশ্রয়ী মূল্যে এবং দ্রুত ক্যানসার শনাক্তকরণ সম্ভব হবে, যা লাখো রোগীর জীবন বাঁচাতে সহায়ক হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *