আধুনিক বডি বিল্ডিং-এর জনকের নামেই ‘স্যান্ডো গেঞ্জি’র নামকরণ, জানতেন?

বডি বিল্ডিং মানেই চওড়া কাঁধ, ভাস্কর্যসম পেশি আর হাতাকাটা জার্সি। কিন্তু এই পরিচিত ‘স্যান্ডো গেঞ্জি’ নামের পোশাকটি কোথা থেকে এলো? ইতিহাস বলছে, অষ্টাদশ শতকের শেষ ভাগে ইউরোপ জুড়ে তুমুল জনপ্রিয় ছিলেন এক জার্মান শক্তিমান ব্যক্তি। তাঁর নাম ইউজেন স্যান্ডো। আধুনিক বডি বিল্ডিং-এর পথিকৃৎ ওই ব্যক্তির নামানুসারেই তৈরি হয়েছিল আজকের এই অতি পরিচিত পোশাকটির নামকরণ।

আজকের ফিটনেস-পাগলা বিশ্বে ‘ট্যাঙ্ক টপ’ বা ‘ভেস্ট’ যেমন অপরিহার্য, তেমনি বাংলার গলিতে কিংবা ঢাকার জিমনেশিয়ামে ‘স্যান্ডো গেঞ্জি’ শব্দটি এখনো অতি পরিচিত। তবে খুব কম মানুষই জানেন, এটি কোনো ব্র্যান্ডের নাম নয়, বরং এক কিংবদন্তি পুরুষের স্মৃতিবিজড়িত এক ইতিহাস।

প্রায় আড়াইশো বছর আগের কথা। ১৮৬৭ সালে জার্মানির কোনিগসবার্গে (বর্তমান রাশিয়ার কালিনিনগ্রাদ) জন্মগ্রহণ করেন ফ্রেডরিখ উইলহেম মুলার। পরবর্তী জীবনে তিনি পরিচিত হন ‘ইউজেন স্যান্ডো’ নামে। মাত্র একুশ বছর বয়সে তিনি রোমে গিয়ে ভাস্কর্যের মডেল হিসেবে কাজ শুরু করেন। প্রাচীন গ্রিক ও রোমান ভাস্কর্যের সৌন্দর্য তাঁর চোখ এড়ায়নি। ভাস্করদের জন্য মডেল হতে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন, পেশি শুধু শক্তির প্রতীক নয়, তা নান্দনিকতারও মাধ্যম।

১৮৯০-এর দশকে তিনি মঞ্চে ‘পেশি প্রদর্শনী’ (Muscle Display Performance) শুরু করেন। যদিও এর আগেও শক্তির প্রতিযোগিতা হতো, স্যান্ডো প্রথম ব্যক্তি যিনি শরীরচর্চাকে নিছক শক্তির জায়গা থেকে তুলে এনে ‘ভাস্কর্যের মতো সৌন্দর্য’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। মঞ্চে তিনি প্রাচীন গ্রিক দেবতা হারকিউলিসের মতো সেজে দর্শকদের মুগ্ধ করতেন। তাঁর সেই উপস্থাপনাই পরবর্তীকালে আধুনিক বডি বিল্ডিং প্রতিযোগিতার ভিত্তি তৈরি করে দেয়।

তবে শুধু পেশি নয়, তাঁর পোশাকও ছিল বৈপ্লবিক। সেই সময় মল্লযোদ্ধা বা ভারোত্তোলকেরা সাধারণত পূর্ণাঙ্গ পোশাক পরে ব্যায়াম করতেন। কিন্তু স্যান্ডো মঞ্চে নামতেন এক অভিনব ধরনের ‘হাতাকাটা’ পোশাকে। কাঁধ খোলা, বুক ও বাহুর পেশি সম্পূর্ণ উদ্ভাসিত রাখা সেই পোশাকটি ছিল সে যুগের ফ্যাশনে এক বিপ্লব। জনশ্রুতি আছে, ব্রিটেনের বিখ্যাত পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ‘জেফরি অ্যান্ড কো’ প্রথম এই পোশাকের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করলে তাঁর নামানুসারেই নামকরণ করা হয় ‘স্যান্ডো ভেস্ট’ বা ‘স্যান্ডো গেঞ্জি’।

বাংলা ভাষায় ‘গেঞ্জি’ শব্দটি যেমন অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে গেছে, তেমনি পশ্চিমা বিশ্বে এখনো ‘ট্যাঙ্ক টপ’-এর পাশাপাশি এই পোশাকের ঐতিহাসিক নামটি উচ্চারিত হয়।

যদিও আজকের প্রজন্ম হয়তো ইউজেন স্যান্ডোর নামটি খুব সহজে চিনতে পারবে না, কিন্তু তার শরীর ও পোশাকের দর্শন এখন গোটা বিশ্বের ফিটনেস সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। কুড়ি শতকের শুরুতে তিনি ‘শরীরচর্চা’কে শুধু ব্যায়ামাগারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং একে একটি ‘শিল্প’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *