নিত্যপণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, চিনি, ডিমসহ অত্যাবশ্যকীয় পণ্যে সিন্ডিকেট ভাঙতে সরকার একটি নতুন কমিশন গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রস্তাবিত এই কমিশনের নাম জাতীয় বাজার স্থিতিশীলতা কমিশন (এনবিএসসি), যা স্থায়ীভাবে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন এই কমিশন গঠনের প্রস্তাবক এবং এর জন্য একটি রূপরেখা প্রণয়ন করেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন কেবল প্রস্তাবই দেয়নি, বরং কমিশনের গঠন ও কার্যক্রমের জন্য একটি বিস্তারিত রূপরেখাও তৈরি করেছে। গত ২৩ জানুয়ারি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এই রূপরেখার ওপর একটি বৈঠক আয়োজন করে। তৎকালীন বাণিজ্যসচিবের পদ শূন্য থাকায় অতিরিক্ত সচিব আবদুর রহিম খানের সভাপতিত্বে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের একটি প্রতিনিধিদল অংশ নেয়, যার মধ্যে ছাত্রপ্রতিনিধি ইফতেখার হোসেন, নিশাত আহমেদ এবং আফজালুর রহমান সায়েম উল্লেখযোগ্য।
বৈঠকে সিন্ডিকেট ও মূল্য কারচুপির বিষয়ে আলোচনা হয়। ইফতেখার হোসেন উল্লেখ করেন, ব্রাজিল থেকে ৪৫ টাকা কেজি দরে চিনি আমদানি করা হলেও শুল্কসহ ৭৫ টাকায় পৌঁছানোর পর বাজারে এর দাম ১৪০-১৫০ টাকা। তিনি ভারতের তুলনায়ও বাংলাদেশে চিনির দাম বেশি বলে উল্লেখ করেন। নিশাত আহমেদ নওগাঁর অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, হিলি স্থলবন্দর থেকে আসা পেঁয়াজ নওগাঁয় ৯০ টাকা কেজি হলেও ঢাকায় ১২০ টাকা এবং জয়পুরহাটে ১১৫ টাকায় বিক্রি হয়। তবে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মোহাম্মদ দাউদুল ইসলাম ট্যারিফ কমিশনের তথ্য উল্লেখ করে জানান, চিনি আমদানির খরচ ১১২ টাকা এবং বাজারদর ১২৫-১৩০ টাকা।
জানুয়ারির বৈঠকের পর উদ্যোগটি কিছুদিন স্থবির ছিল। তবে জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের তাগিদে ফেব্রুয়ারির শেষে নিয়মিত বাণিজ্যসচিব হিসেবে মাহবুবুর রহমান যোগ দেওয়ার পর গতি ফিরে। গত ১৬ মার্চ বাণিজ্য মন্ত্রণালয় চারটি প্রতিষ্ঠান—বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন, ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি), বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি) এবং জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর—কে রূপরেখা পর্যালোচনা করে মতামত দেওয়ার জন্য চিঠি পাঠায়। প্রতিষ্ঠানগুলো প্রাথমিকভাবে মতামত না দেওয়ায় ১০ এপ্রিল পুনরায় তাগিদ দেওয়া হয়।
চিঠিতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রস্তাবিত কমিশনের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, ক্ষমতা ও দায়িত্বের সঙ্গে তাদের নিজস্ব কার্যক্রমের কোনো দ্বৈততা আছে কিনা, তা যাচাই করতে বলা হয়। বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, “মতামত পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে বৈঠক ডাকব। এরপর সময়সীমা ঠিক করব।”
রূপরেখা অনুযায়ী, জাতীয় বাজার স্থিতিশীলতা কমিশনের মূল উদ্দেশ্য বাজার ব্যবস্থাপনাকে সুষ্ঠু, কার্যকর ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। এর কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে:
- মূল্য, সরবরাহ ও চাহিদা নিয়ন্ত্রণ: বাজারে সঠিক মূল্য নিশ্চিত করা।
- সিন্ডিকেট ও অবৈধ কার্যক্রম রোধ: চাল, ডাল, চিনি, ভোজ্যতেল, মাংস, ডিম, আলু, পেঁয়াজ, মাছ, সবজি ও সারে সিন্ডিকেট ভাঙা।
- বাজার তদারকি: মজুত নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিযোগিতামূলক বাজার সৃষ্টি।
- ভোক্তা সচেতনতা: জনগণের মধ্যে বাজার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি।
- পুরস্কার ও শাস্তি: ন্যায্য মূল্যে পণ্য বিক্রেতাদের পুরস্কৃত করা এবং সিন্ডিকেটে জড়িতদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা ও লাইসেন্স বাতিলের ব্যবস্থা।
কমিশনের প্রস্তাবিত কাঠামোতে থাকবে একজন চেয়ারম্যান, নির্বাহী পরিচালক, সদস্য, পরামর্শক প্যানেল, বাজার বিশ্লেষক দল, আইনি কমিটি এবং ভোক্তা সুরক্ষা বিভাগ। পরামর্শক কমিটিতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, আইনবিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ, কৃষিবিদ, ব্যবসায়ী নেতা ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের প্রতিনিধি থাকবেন।









































































































































































