বিপুল মুনাফা অর্জনের পরও চট্টগ্রাম বন্দরে বেড়েছে মাশুল

চট্টগ্রাম বন্দর, দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর, প্রতিবছর বিপুল মুনাফা অর্জন করছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বন্দরের রাজস্ব উদ্বৃত্ত ছিল ২ হাজার ৯১২ কোটি টাকা, আর কর পরিশোধের পর নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ১৮৪ কোটি টাকা। তবুও, বন্দর কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সেবার মাশুল ৪১ শতাংশ বাড়িয়েছে, যা ১৫ অক্টোবর থেকে কার্যকর হয়েছে। এই সিদ্ধান্তে ব্যবসায়ীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

মাশুল বৃদ্ধির পেছনে যুক্তি

বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত ৪০ বছরে মাশুল বৃদ্ধি খুব কম হয়েছে। ২০০৭ সালে ৫২টি সেবার মধ্যে মাত্র ৫টির মাশুল বাড়ানো হয়েছিল। এ সময়ে যন্ত্রপাতি, জ্বালানি, জনবল এবং রক্ষণাবেক্ষণের খরচ বহুগুণ বেড়েছে। বন্দরের চলমান ও পরিকল্পনাধীন প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রায় ৩৩ হাজার ৩২১ কোটি টাকা প্রয়োজন, যা এই মাশুল বৃদ্ধির মাধ্যমে জোগান দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বন্দরের দাবি, এই বৃদ্ধি প্রতি কনটেইনারে গড়ে ৩ হাজার ৮০০ টাকা বাড়তি খরচ যোগ করবে, যা পণ্যের মূল্যে কেজিপ্রতি মাত্র ১২ পয়সা প্রভাব ফেলবে। তুলনামূলকভাবে, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বন্দরের তুলনায় চট্টগ্রামের মাশুল এখনো কম।

বিদেশি অপারেটরদের প্রবেশ

মাশুল বৃদ্ধির সময়টিও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সরকার চট্টগ্রাম বন্দরের চারটি টার্মিনালের দায়িত্ব বিদেশি অপারেটরদের হাতে তুলে দিচ্ছে। লালদিয়া এবং নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল শিগগিরই বিদেশি কোম্পানির হাতে হস্তান্তর হবে। এছাড়া, বে টার্মিনাল প্রকল্পের দুটি টার্মিনালও ভবিষ্যতে বিদেশি অপারেটরদের দেওয়া হতে পারে। কর্তৃপক্ষের যুক্তি, এটি সেবার মান উন্নত করবে। তবে ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, বিদেশি অপারেটরদের সুবিধা দেওয়ার জন্যই মাশুল বাড়ানো হয়েছে।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ

পোর্ট ইউজার্স ফোরামের আহ্বায়ক আমীর হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বন্দরের মাশুল মার্কিন ডলারে আদায় হয়। ২০২২ সালে ডলারের দাম ছিল ৮৬ টাকা, যা এখন বেড়ে ১২২ টাকা হয়েছে। এর ফলে মাশুলের পরিমাণ ইতিমধ্যে ৪২ শতাংশ বেড়েছে। এর ওপর আবার ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি যৌক্তিক নয় বলে তিনি মনে করেন। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, এই বাড়তি খরচ আমদানিকারকরা ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দেবে, আর রপ্তানিতে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমবে।

মুনাফার চিত্র

দেশে তিনটি সমুদ্রবন্দর—চট্টগ্রাম, মোংলা ও পায়রা—থাকলেও আমদানি-রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশই চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে হয়। গত এক দশকে বন্দরের মোট রাজস্ব আয় ছিল প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে খরচ হয়েছে সাড়ে ১৭ হাজার কোটি টাকা। ফলে রাজস্ব উদ্বৃত্ত ছিল সাড়ে ১৭ হাজার কোটি টাকা, আর কর পরিশোধের পর নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার কোটি টাকা। বন্দরের তহবিলে বর্তমানে সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকা রয়েছে, যা পেনশন ও অন্যান্য সুবিধার জন্য সংরক্ষিত অর্থের বাইরে। এছাড়া, চট্টগ্রাম বন্দর পায়রা বন্দরের উন্নয়নে ৪৬২ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

নৌপরিবহন উপদেষ্টা সাখাওয়াত হোসেন জানান, মাশুল বৃদ্ধির আগে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বিশ্লেষণ করেছে এবং বন্দর ব্যবহারকারীদের সঙ্গে দুই দফা আলোচনা হয়েছে। তিনি প্রশ্ন রাখেন, ৪০ বছর পরও কি মাশুল বাড়ানো যাবে না? তবে, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, একলাফে ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি যুক্তিযুক্ত নয়। তিনি পরামর্শ দেন, এটি তিন বছরে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। তিনি আরও বলেন, বাড়তি মাশুলের অর্থ কোথায় বিনিয়োগ হবে এবং সেবার মান কতটুকু বাড়বে, তা বন্দর কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট করা উচিত।

ভবিষ্যৎ প্রভাব

বন্দর কর্তৃপক্ষের মতে, মাশুল বৃদ্ধির ফলে আগামী বছরগুলোতে বন্দরের আয় আরও বাড়বে। তবে, ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, এটি ভোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে এবং রপ্তানি বাণিজ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হ্রাস করতে পারে। বিদেশি অপারেটরদের হাতে টার্মিনাল হস্তান্তর এবং মাশুল বৃদ্ধির এই সমন্বয় কীভাবে বন্দরের সেবার মান উন্নত করবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

আরও পড়ুন: বিমানবন্দরের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় রপ্তানিকারকদের ছয় দাবি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *