বিশ্ব অর্থনীতির টালমাটাল পরিস্থিতির সুযোগে সোনার বাজার যেন পাগলা ঘোড়া। আন্তর্জাতিক বাজারে আউন্সপ্রতি সোনার দাম অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে গড়েছে নতুন ইতিহাস। স্পট মার্কেটে দামের এই উলম্ফন সরাসরি প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে বাংলাদেশের বাজারেও। জুয়েলারি খাতের সংশ্লিষ্টরা আভাস দিয়েছেন, যেকোনো মুহূর্তে দেশের বাজারে সোনার দাম আবারও বাড়ার ঘোষণা আসতে পারে, যা মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে আজ সোনার দাম যে উচ্চতা স্পর্শ করেছে, তা এর আগে কখনো দেখেনি বিনিয়োগকারীরা। সাধারণত বৈশ্বিক রাজনীতিতে অস্থিরতা, যুদ্ধের দামামা কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার কমানোর আভাস পেলেই বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ আশ্রয় বা ‘সেফ হ্যাভেন’ হিসেবে সোনা কিনতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং ডলারের মানের ওঠানামা সোনার এই রেকর্ড ভাঙা দৌড়ে ইন্ধন জুগিয়েছে। যখনই মুদ্রাবাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়, তখনই কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এবং বড় বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণের মজুদ বাড়াতে শুরু করেন। চাহিদার এই তুঙ্গে থাকা অবস্থাই দামকে আকাশচুম্বী করে তুলেছে।

বিশ্ববাজারের এই উত্তাপের আঁচ ইতিমধ্যেই লাগতে শুরু করেছে ঢাকার তাঁতীবাজার থেকে শুরু করে দেশের অভিজাত জুয়েলারি শপগুলোতে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)-এর প্রাইসিং কমিটি নিয়মিত আন্তর্জাতিক বাজার পর্যবেক্ষণ করে দেশের বাজারে দাম সমন্বয় করে। বাজুসের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, বিশ্ববাজারে দামের যে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা, তাতে দেশের বাজারে দাম না বাড়িয়ে উপায় নেই।

বর্তমানে দেশের বাজারে ভালো মানের বা ২২ ক্যারেট সোনার দাম এমনিতেই সাধারণের ক্রয়ক্ষমতার সীমানায় নেই। এর ওপর যদি নতুন করে ভরিতে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা বাড়ে, তবে তা গয়নাপ্রমী মানুষের জন্য বড় দুঃসংবাদ হয়ে আসবে। বিশেষ করে এখন দেশে বিয়ের মৌসুম চলছে। এই সময়ে সোনার দাম বাড়লে কনে পক্ষ ও বর পক্ষ—উভয়কেই বাড়তি বাজেটের চাপে পড়তে হবে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, শুধু দাম বাড়াই নয়, দামের অস্থিতিশীলতার কারণে বেচাকেনাতেও ভাটা পড়েছে। মানুষ এখন গয়না কেনার চেয়ে পুরনো সোনা বিক্রি করতেই বেশি আগ্রহী। কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় ছোট ও মাঝারি স্বর্ণ ব্যবসায়ীরাও অস্তিত্ব সংকটে পড়ছেন।

একনজরে মূল বিষয়গুলো

  • রেকর্ড ব্রেকিং: আন্তর্জাতিক বাজারে আউন্সপ্রতি সোনার দাম সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
  • বাজুসের বৈঠক: দেশের বাজারে দাম সমন্বয়ের জন্য বাজুসের স্ট্যান্ডিং কমিটি অন প্রাইসিং অ্যান্ড মনিটরিং খুব শিগগিরই জরুরি বৈঠকে বসতে পারে।
  • ভোক্তা পর্যায়ে প্রভাব: দাম বাড়লে বিয়ের মৌসুমে গয়না কেনাকাটায় বড় ধরনের ধস নামার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
  • স্মাগলিং উদ্বেগ: পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় দামের বড় পার্থক্য তৈরি হলে সীমান্তে সোনা চোরাচালান বৃদ্ধির ঝুঁকিও দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

সোনার এই লাগামহীন দৌড় কোথায় গিয়ে থামবে, তা এখনই হলফ করে বলতে পারছেন না কোনো বিশ্লেষক। বিশ্ব অর্থনীতির আকাশ থেকে কালো মেঘ না সরা পর্যন্ত এই মূল্যবান ধাতুটির ঔজ্জ্বল্য কমার কোনো লক্ষণ নেই।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, ডলার সংকট এবং আমদানিনির্ভরতার কারণে বিশ্ববাজারের সামান্য ঢেউ এখানে সুনামির মতো আঘাত করে। বাজুস যদি আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে তাল মিলিয়ে দাম বাড়ায়, তবে খুব শিগগিরই আমরা হয়তো এক ভরি সোনার দামে নতুন কোনো অবিশ্বাস্য সংখ্যা দেখতে পাব। সাধারণ মানুষের জন্য সোনা এখন আর কেবল আভিজাত্যের প্রতীক নয়, বরং দীর্ঘশ্বাসের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *