ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে সামরিক হামলা স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে।
সোমবার (২৩ মার্চ) অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৭ ডলার বা ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে ৯৬ ডলারে নেমে এসেছে। যুদ্ধবিরতির আভাসে একদিনেই ডুবে গেল কয়েক সপ্তাহের মূল্যস্ফীতি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি। ইরানের গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎকেন্দ্র ও জ্বালানি স্থাপনায় আকস্মিক হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী। জবাবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয় তেহরান। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও এলএনজি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যে এই প্রণালি দিয়ে যায়, তার প্রভাব পড়ে বাজারে। প্রণালিটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরবরাহ শৃঙ্খলে চরম সংকট তৈরি হয়। যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম লাফিয়ে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। কখনো কখনো তা যুদ্ধের আগের তুলনায় ৫০ শতাংশের বেশি বেড়ে যায়। ভোক্তা দেশগুলোতে জ্বালানি সংকটের শঙ্কা তৈরি হয়।
কিন্তু হঠাৎ করেই পাল্টে গেল সমীকরণ। সোমবার (২৩ মার্চ) যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে বিমান হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে তার প্রশাসন। তিনি বলেন, “আমরা চাই না এই সংকট আরও প্রসারিত হোক। কূটনৈতিক পথ খোলা রাখতে চাই।” ট্রাম্পের এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই আন্তর্জাতিক বাজারে নেমে আসে স্বস্তির ছায়া।
সরাসরি প্রভাব পড়ে অপরিশোধিত তেলের দামে। সোমবার লন্ডনের আইসিই ফিউচারসে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৭ ডলার বা ১৫ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ৯৬ ডলারে। অপর দিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৩ ডলার বা ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ কমে ৮৫ দশমিক ২৮ ডলারে নেমে এসেছে। জ্বালানি খাতে এটি গত তিন মাসের মধ্যে একদিনের সবচেয়ে বড় পতন।
ভূ-রাজনীতির খেলায় জ্বালানি বাজার
এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করল, বিশ্বের তেলবাজার কতটা ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার ওপর নির্ভরশীল। হরমুজ প্রণালি মূলত ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী একটি কৌশলগত জলপথ। উপসাগরীয় তেল উৎপাদনকারী দেশ সৌদি আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রায় পুরো তেল রফতানি এই পথে যায়। ইরান যখন এই প্রণালি বন্ধ করে দেয়, তখন সরবরাহ সংকট তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক।
গত কয়েক সপ্তাহে তেলের দামের চড়াই-উতরাই যেন এক ভূ-রাজনৈতিক নাটকের প্রতিচ্ছবি ছিল। ২৮ ফেব্রুয়ারি হামলার পর দাম চড়তে শুরু করে। মার্চের প্রথম সপ্তাহে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১২০ ডলারের ঘর ছোঁয়ার মতো অবস্থা তৈরি হয়েছিল। তবে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনার খবর ছড়িয়ে পড়লে গত দুই সপ্তাহে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছিল। ট্রাম্পের সর্বশেষ ঘোষণা সেই স্বস্তিকে চূড়ান্ত রূপ দিল।
মূল তথ্যসমূহ:
-
দামের পতন: সোমবার ব্রেন্ট ক্রুড ১৫ শতাংশ (প্রায় ১৭ ডলার) কমে ৯৬ ডলারে, ডব্লিউটিআই ১৩.৫ শতাংশ কমে ৮৫.২৮ ডলারে।
-
হরমুজ প্রণালি: বিশ্বের মোট তেল ও এলএনজি সরবরাহের ২০ শতাংশ (প্রায় এক-পঞ্চমাংশ) এই প্রণালি দিয়ে যায়।
-
সংঘাতের সূত্রপাত: ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে মার্কিন হামলা; জবাবে ইরান বন্ধ করে দেয় হরমুজ প্রণালি।
-
মূল্যস্ফীতির ইতিহাস: যুদ্ধ শুরুর পর তেলের দাম সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছিল, ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছিল।
-
ভোক্তা দেশের স্বস্তি: তেল আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য এটি বড় স্বস্তি; বাংলাদেশের মতো দেশেও জ্বালানি বিল কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
অর্থনৈতিক প্রভাব ও বিশ্লেষণ
এই দামপতনের প্রভাব পড়বে বিশ্ব অর্থনীতিতে। একদিকে তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর রাজস্ব কমতে পারে, অন্যদিকে তেল আমদানিকারক দেশগুলো স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দেখলে, দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার বিশাল অংশই আমদানি নির্ভর। গত কয়েক সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) লোকসানের মুখে পড়েছিল। এই দাম কমায় আমদানি ব্যয় কমবে, যা স্থানীয় বাজারেও প্রভাব ফেলতে পারে।
জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি চালু হলে এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনা কমলে দাম আরও নিচে নামতে পারে। তবে এখনই পুরোপুরি স্বস্তির পরিবেশ ফিরেছে বলে ধরে নেওয়া যাচ্ছে না। ট্রাম্প প্রশাসন স্পষ্ট জানিয়েছে, তারা হামলা স্থগিত করলেও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেনি। ইরানও এখনো হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেয়নি। তাই যেকোনো সময় নতুন করে অস্থিরতা ফিরে আসার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।




















































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































