কোরবানির ঈদের পর চামড়ার বাজারে চরম ধস নেমেছে বলে অভিযোগ করেছেন রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা। লোকসানের ভারে অনেকেই এখন ব্যবসা ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছেন। কম দামে চামড়া কিনে আরও কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ায় ক্ষোভ আর হতাশা বাড়ছে মাঠপর্যায়ে।
তারাগঞ্জের মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ী আজিজুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “লাভ তো দূরের কথা, পকেটের টাকা খোয়া যাচ্ছে। চামড়া এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।” তিনি জানান, গ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতি গরুর চামড়া ৪০০ টাকা পর্যন্ত দামে কিনে বাজারে এনে পাইকারদের কাছে মাত্র ১৫০ টাকার প্রস্তাব পাচ্ছেন। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে ভ্যান ভাড়া, শ্রমিক খরচ ও বাজারের টোল।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, প্রতিবছর ঈদকে কেন্দ্র করে চামড়ার অস্থায়ী বাজার জমে উঠলেও এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। সরকারিভাবে চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হলেও মাঠপর্যায়ে তার বাস্তব প্রতিফলন নেই। ফলে ছোট ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
তারাগঞ্জ বাজার ঘুরে দেখা গেছে, অনেক ব্যবসায়ী সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত চামড়া নিয়ে বসে থাকলেও কাঙ্ক্ষিত দাম পাচ্ছেন না। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করছেন, আবার অনেকে লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করার চেষ্টা করছেন ভবিষ্যতে ভালো দামের আশায়। তবে সংরক্ষণেও বাড়তি খরচ থাকায় উদ্বেগ কমছে না।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, স্থানীয় পর্যায়ে সিন্ডিকেটের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। হাতে গোনা কয়েকজন বড় পাইকার বাজার নিয়ন্ত্রণ করায় মৌসুমি ব্যবসায়ীরা দরকষাকষির সুযোগ পাচ্ছেন না। অনেকে বলছেন, ট্যানারি মালিকদের সঙ্গে পাইকারদের সমন্বয়ের অভাবে পুরো চাপ গিয়ে পড়ছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর।
চামড়া ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানান, কোরবানির সময় গ্রামাঞ্চলে বহু মানুষ মৌসুমি ব্যবসায় যুক্ত হন। কেউ নিজের সঞ্চয়, কেউ আবার ধারদেনা করে চামড়া কিনে থাকেন। কিন্তু বাজারে দরপতনের কারণে তাদের বড় অংশ এবার লোকসানে পড়েছেন। এতে আগামী বছর এ খাতে আগ্রহ কমে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চামড়া ব্যবসায়ীদের প্রধান অভিযোগ
- সরকার নির্ধারিত দামের প্রতিফলন নেই স্থানীয় বাজারে
- পাইকাররা অনেক কম দামে চামড়া কিনছেন
- পরিবহন ও টোল খরচে বাড়ছে লোকসান
- সংরক্ষণে অতিরিক্ত লবণ ও শ্রম ব্যয় হচ্ছে
- বাজারে বড় ব্যবসায়ীদের প্রভাব বেশি
স্থানীয় অর্থনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, চামড়া বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি খাতগুলোর একটি হলেও এর সংগ্রহ ও বিপণন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের দুর্বলতা রয়ে গেছে। কাঁচা চামড়া সংরক্ষণ, দ্রুত পরিবহন এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে কার্যকর তদারকি না থাকলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বারবার ক্ষতির মুখে পড়বেন।
এদিকে সাধারণ বিক্রেতাদের মধ্যেও হতাশা দেখা গেছে। অনেকেই বলছেন, চামড়ার ন্যায্য দাম না পাওয়ায় কোরবানির পর প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুবিধা মিলছে না। ফলে ঈদের পর যে অস্থায়ী অর্থচক্র তৈরি হওয়ার কথা, সেটিও এবার অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছে।
চামড়ার বাজারে এই অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা এ খাত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত না করলে দেশের ঐতিহ্যবাহী চামড়া শিল্প আরও বড় সংকটে পড়তে পারে।











































































































































































































