কলকাতার যাদবপুরের বিক্রমগড় এলাকায় গ্রেপ্তার হওয়া বাংলাদেশি মডেল শান্তা পালের (২৮) নামে চারটি গাড়ি এবং দুটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সন্ধান পেয়েছে পুলিশ। তদন্তে জানা গেছে, তিনি একটি গেস্ট হাউজ তৈরির জন্য ব্যাংক ঋণও নিয়েছিলেন, তবে সেই ঋণ তার নিজের নামে নয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। শান্তার গ্রেপ্তারির পর তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই রহস্য বাড়ছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, শান্তা পালের নামে থাকা চারটি গাড়ি ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহৃত হতো। এই গাড়িগুলো কার নামে কেনা হয়েছে এবং কীভাবে অর্থের জোগান দেওয়া হয়েছে, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। এছাড়া, শান্তা একটি গেস্ট হাউজ কেনার পরিকল্পনা করেছিলেন এবং এজন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছিলেন। তবে, তদন্তকারীদের ধারণা, এই ঋণ তার নিজের নামে নয়, অন্য কারও নামে নেওয়া হয়েছে।
শান্তাকে গত সোমবার (২৮ জুলাই, ২০২৫) কলকাতার বিক্রমগড় এলাকায় তার ভাড়া বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তল্লাশির সময় তার বাসা থেকে দুটি আধার কার্ড (একটি কলকাতার ঠিকানায়, অপরটি বর্ধমানের ঠিকানায়), একটি ভোটার কার্ড, রেশন কার্ড, প্যান কার্ড এবং বাংলাদেশি পাসপোর্ট, রিজেন্ট এয়ারওয়েজের কর্মচারী কার্ড ও ঢাকার মাধ্যমিক পরীক্ষার অ্যাডমিট কার্ড উদ্ধার করা হয়।
বর্ধমানের ঠিকানায় পাওয়া ভোটার কার্ডের বিষয়ে তথ্য যাচাইয়ের জন্য ইতিমধ্যে নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হয়েছে। পুলিশ তদন্ত করছে, শান্তা কখনো বর্ধমানে বসবাস করেছিলেন কি না।
শান্তা ২০২৩ সালে বৈধ পাসপোর্ট নিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন এবং প্রথমে কলকাতার পার্ক স্ট্রিট এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকেন। পরে তিনি বিক্রমগড়ে স্থানান্তরিত হন। তিনি বাংলাদেশের বরিশালের বাসিন্দা এবং রিজেন্ট এয়ারওয়েজে কেবিন ক্রু হিসেবে কাজ করতেন।
আরও পড়ুন: কলকাতায় গ্রেপ্তার মডেল-অভিনেত্রী শান্তা পাল, জালিয়াতির অভিযোগ
এছাড়া, তিনি বাংলাদেশে মডেলিং, নাটক ও সিনেমায় কাজ করেছেন এবং ২০১৬ সালে ইন্দো-বাংলা বিউটি প্রেজেন্ট এবং ২০১৯ সালে মিস এশিয়া গ্লোবাল প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে পুরস্কার জিতেছেন। ভারতে এসে তিনি তেলুগু ও বাংলা চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন এবং সম্প্রতি একটি ওড়িয়া চলচ্চিত্রে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন।
পুলিশ জানিয়েছে, শান্তা তার সামাজিক মাধ্যমে ‘আসান ট্রাভেলস কলকাতা অ্যান্ড বাংলাদেশ’ নামে একটি পেজ পরিচালনা করতেন, যেখানে তিনি পর্যটন ব্যবসার প্রচার করতেন এবং বাংলাদেশি নাগরিকদের ভারতে মেডিকেল ভিসা পাওয়ার পরামর্শ দিতেন। তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছে, তিনি কতজনকে এই ভিসার জন্য সহায়তা করেছেন। এছাড়া, তিনি একটি গাড়ি ভাড়ার ব্যবসা পরিচালনা করতেন, যার জন্য জাল ভারতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করেছেন বলে অভিযোগ।
শান্তার স্বামী শেখ মোহাম্মদ আশরাফ, আন্ধ্রপ্রদেশের বাসিন্দা এবং মার্চেন্ট নেভিতে কাজ করেন। পুলিশ জানিয়েছে, শান্তা তার স্বামীর পাসপোর্ট নিজের কাছে রেখেছিলেন এবং তারা একসঙ্গে কলকাতায় সম্পত্তি কিনেছিলেন। এই দম্পতি পার্ক স্ট্রিট থেকে গলফ গ্রিনে স্থানান্তরিত হয়েছিল। তাদের সঙ্গে শান্তার বাবা-মাও বিক্রমগড়ের ভাড়া বাসায় থাকতেন, যারা বর্তমানে তদন্তের আওতায় রয়েছেন।
আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্রে ছেলের সঙ্গে শাকিব-বুবলী
তদন্তে আরও জানা গেছে, শান্তা পালের ভিসা ২০২১ সালে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছিল, এবং তিনি অবৈধভাবে ভারতে অবস্থান করছিলেন। পুলিশ সন্দেহ করছে, তিনি জাল পরিচয়পত্র ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক ভ্রমণের পরিকল্পনা করছিলেন, কারণ বাংলাদেশ থেকে তিনি কিছু দেশে ভ্রমণ করতে পারছিলেন না।
এই জালিয়াতির পেছনে স্থানীয় এজেন্টদের ভূমিকা ছিল, এবং পুলিশ ইতিমধ্যে এই কাজে জড়িত সৌমিক দত্ত (নৈহাটি) এবং শেখ মমতাজউদ্দিন (মেমারি, পূর্ব বর্ধমান) নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে।
পুলিশ এখন শান্তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা ও লেনদেনের বিষয়ে তদন্ত করছে, যাতে কোনো ফিকটিশিয়াস লেনদেন ছিল কি না তা যাচাই করা যায়। এছাড়া, তার সামাজিক মাধ্যমের পোস্টগুলো বিশ্লেষণ করা হচ্ছে, যেখানে তিনি একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে ভারতীয় ও বাংলাদেশি পরিচয়পত্র থাকার অভিযোগ তুলেছিলেন, যা পুলিশের মতে, তার নিজের অপরাধ থেকে দৃষ্টি সরানোর কৌশল হতে পারে।
শান্তাকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত পুলিশি হেফাজতে রাখা হয়েছে। তদন্তে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, নির্বাচন কমিশন এবং ইউআইডিএআই-এর সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে, যাতে জাল পরিচয়পত্র তৈরির প্রক্রিয়া এবং এতে কোনো কর্মকর্তার জড়িত থাকার বিষয়টি খতিয়ে দেখা যায়।













































































































































































































































