মহেন্দ্র সিংহ ধোনি—ভারতীয় ক্রিকেটের এক কিংবদন্তি নাম। ৯০টি টেস্ট, ৩৫০টি ওয়ানডে এবং ৯৮টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলে ২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়েছিলেন তিনি। তখন ভক্তদের প্রশ্ন ছিল, “এখনই কেন?” কিন্তু ২০২৫ সালে এসে সেই প্রশ্ন বদলে গেছে। এখন ভক্তরা বলছেন, “এখনও নয় কেন?” আইপিএলের মঞ্চে ধোনির ধারাবাহিক ব্যর্থতা এবং তার অবসর গ্রহণের অনিশ্চয়তা ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে হতাশা ও প্রশ্ন তৈরি করছে।
ধোনি কখনো রেকর্ড বা মাইলফলকের পেছনে ছোটেননি। তিনি ছিলেন একজন খাঁটি ক্রিকেটার, যিনি খেলার জন্য খেলতেন। কিন্তু আইপিএলের মতো ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে তিনি যেন অতীতের গৌরব আঁকড়ে ধরে আছেন। চেন্নাই সুপার কিংসের হয়ে ১৭ বছর ধরে খেলা ধোনি এখনও মাঠে নামছেন, কিন্তু তার পারফরম্যান্স আর আগের মতো নেই। এই মরশুমে ১১ ম্যচে ১৬৩ রান, সর্বোচ্চ অপরাজিত ৩০, গড় ২৩.২৯ এবং স্ট্রাইক রেট ১৪৮.১৮—এই পরিসংখ্যান ধোনির মানের সঙ্গে মেলে না। শনিবার রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর কাছে ২ রানে হারের পর ধোনি নিজেই দায় স্বীকার করেছেন, বলেছেন, “চাপ কমাতে আরও দুটো বড় শট খেলা দরকার ছিল, আমি পারিনি।” কিন্তু এই দায় স্বীকার কি যথেষ্ট?
এক সময়ের ‘ফিনিশার’ ধোনি, যিনি ম্যাচের শেষ ওভারে খেলা উলটে দিতেন, এখন আর সেই জাদু দেখাতে পারছেন না। তার ৮ বলে ১২ রানের ইনিংস চেন্নাইকে জয় এনে দিতে ব্যর্থ হয়েছে। অধিনায়ক হিসেবেও তার সিদ্ধান্তে প্রশ্ন উঠছে। তরুণ শিবম দুবেকে ইমপ্যাক্ট প্লেয়ার হিসেবে ব্যবহার না করে নিজে ব্যাটিংয়ে নামা—এটি কি আত্মবিশ্বাস না অতিরিক্ত চাপ নেওয়ার প্রচেষ্টা? ধোনির ক্রিকেট মস্তিষ্ক, যা একসময় প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করত, এখন আর তেমন ধারালো নয়। আইপিএলের এই মঞ্চ এখন সূর্যবংশী, প্রিয়াংশ আর্য, আয়ুষ মাত্রের মতো তরুণদের। ধোনির মতো কিংবদন্তি এই মঞ্চে আর মানিয়ে নিতে পারছেন না।
ধোনির আইপিএল যাত্রা এখন অতীতের ছায়ায় আটকে আছে। তার ব্যাটিংয়ে গতি নেই, ক্রিজে দ্রুত দৌড়ানোর ক্ষমতা কমে গেছে, উইকেটকিপিংয়েও ধারাবাহিকতা হারিয়েছে। তবুও তিনি খেলে চলেছেন। বিসিসিআইয়ের নতুন নিয়মে তাকে ‘ঘরোয়া ক্রিকেটার’ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে, যা তার কিংবদন্তি মর্যাদার সঙ্গে বেমানান। চেন্নাই সুপার কিংস তাকে ৪ কোটি টাকায় ধরে রেখেছে, কিন্তু এটি কি ধোনির জনপ্রিয়তাকে ব্যবসায়িকভাবে কাজে লাগানোর কৌশল? সিএসকে কর্তৃপক্ষ ১৭ বছরেও ধোনির বিকল্প তৈরি করতে পারেনি, তাই তারা অতীতের গৌরবের উপর ভর করে চলছে।
ধোনির ভক্তরা এখনও তাকে মাঠে দেখে উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েন। কিন্তু এই উচ্ছ্বাস কতদিন টিকবে? এমএ চিদম্বরম স্টেডিয়ামে ভক্তরা ধোনির জন্য আসেন, কিন্তু ফিরে যান হতাশায়। ২০১১ সালে বিশ্বকাপ জয়ের সেই ছক্কা, ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামের সংরক্ষিত আসন—এই স্মৃতিগুলোই ধোনির প্রকৃত পরিচয়। কিন্তু বর্তমান ধোনি সেই স্মৃতির ছায়ামাত্র। তার খেলা এখন ভক্তদের চোখে আরাম দিলেও মন ভরাতে পারছে না।
ধোনি একসময় নিখুঁত সময়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়ে ভক্তদের মনে আফসোস তৈরি করেছিলেন। কিন্তু আইপিএলে তার অবসরের অনিশ্চয়তা এখন ভিন্ন ধরনের আফসোস তৈরি করছে। তিনি কি চেন্নাইয়ের চাপে খেলে যাচ্ছেন? নাকি নিজের জনপ্রিয়তার মোহে আটকে আছেন? অ্যাডাম গিলক্রিস্টের মতো তার অন্ধ ভক্তরাও বলছেন, “এবার অবসর নেওয়া উচিত।” কিন্তু ধোনি এই পরামর্শ শোনেন না, সমাজমাধ্যম বা বিশ্লেষকদের মতামত দেখেন না।
চেন্নাই সুপার কিংস ধোনির জনপ্রিয়তাকে ব্যবহার করে ব্যবসায়িক সাফল্য অর্জন করছে। তাকে ‘থালা’ হিসেবে উপস্থাপন করে মুনাফা কামাচ্ছে। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় ধোনির ক্রিকেটীয় উত্তরাধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি যে ক্রিকেটার একটি দেশকে দুটি বিশ্বকাপ এবং চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি উপহার দিয়েছিলেন, তার এই অবস্থা ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্য বেদনাদায়ক।


















































































































































































































































































































































































































































