বন্দরনগরী চট্টগ্রামের ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকা টেরিবাজারে একটি ১২তলা ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় বিষাক্ত ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে দুইজনের করুণ মৃত্যু হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সকালে সংঘটিত এই দুর্ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আগুনের শিখার চেয়েও ভবনের ভেতরে আটকে পড়া ধোঁয়া মৃত্যুর প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আগুনের সূত্রপাত ও আতঙ্ক
বৃহস্পতিবার সকাল ঠিক ১০টা। প্রতিদিনের মতোই জমজমাট হয়ে উঠছিল টেরিবাজারের বক্সির বিট এলাকা। ঠিক সেই মুহূর্তে ‘অর্কিড প্লাজা’ নামক ১২তলা ভবনটির চতুর্থ তলার একটি দোকান থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখেন স্থানীয়রা। মুহূর্তের মধ্যেই সেই ধোঁয়া সিঁড়ি বেয়ে ওপরের তলাগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। আতঙ্কে ভবনের ভেতরে থাকা মানুষজন ছোটাছুটি শুরু করেন। অনেকে ছাদে আশ্রয় নিলেও কয়েকজন ওপরের তলাগুলোতে আটকা পড়েন।
খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। ১২তলা এই বিশাল ভবনের সংকীর্ণ পথে ধোঁয়া অপসারণ করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় উদ্ধারকারীদের জন্য। চতুর্থ তলার আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলা ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে, যা মূলত প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।
উদ্ধার অভিযান ও মর্মান্তিক মৃত্যু
উদ্ধারকারীরা ভবনের বিভিন্ন তলা থেকে ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়া তিনজনকে উদ্ধার করে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে পাঠান। উদ্ধারকৃতদের মধ্যে দুইজন ভবনের পঞ্চম তলা থেকে এবং একজন ষষ্ঠ তলা থেকে উদ্ধার করা হয়। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় বেলা পৌনে ১২টার দিকে দুইজনের মৃত্যু নিশ্চিত করেন চিকিৎসকরা।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই নুরুল আলম আশেক জানান, নিহতরা হলেন— মোহাম্মদ ইউনূস (৫২) এবং সোলায়মান (২৮)। তাদের উভয়েরই বাড়ি চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলায়। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, শরীরে সরাসরি অগ্নিদগ্ধ হওয়ার চেয়েও অতিরিক্ত কার্বন-মনোক্সাইড গ্যাস ফুসফুসে ঢুকে পড়ায় তাদের মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে অপর একজন হাসপাতালে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
অগ্নিকাণ্ডের নেপথ্যে ও বর্তমান পরিস্থিতি
প্রাথমিক তদন্তে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ভবনের অগ্নি-নির্বাপণ ব্যবস্থা কতটুকু কার্যকর ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। টেরিবাজারের মতো ঘিঞ্জি এলাকায় ১২তলা ভবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে এখন নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ঘটনার প্রধান তথ্যসমূহ:
-
স্থান: অর্কিড প্লাজা (১২তলা ভবন), বক্সির বিট, টেরিবাজার, চট্টগ্রাম।
-
সময়: সকাল ১০টা (আগুনের সূত্রপাত), বেলা পৌনে ১২টা (মৃত্যু ঘোষণা)।
-
নিহত: মোহাম্মদ ইউনূস (৫২) ও সোলায়মান (২৮); উভয়েই পটিয়ার বাসিন্দা।
-
আহত: ১ জন চিকিৎসাধীন।
-
আগুনের উৎস: ভবনের চতুর্থ তলার একটি দোকান।
নিরাপত্তার সংকট ও আগামীর সতর্কতা
চট্টগ্রামের পুরনো বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতে ভবন নির্মাণে আইন মানা হলেও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে। অর্কিড প্লাজার এই ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করল যে, উচ্চতা বাড়লেও জীবন রক্ষার সরঞ্জাম বা আপদকালীন বহির্গমন পথ (Emergency Exit) না থাকলে যেকোনো ছোট আগুনও বড় ট্র্যাজেডিতে রূপ নিতে পারে।
টেরিবাজারের ব্যবসায়ীরা জানান, এলাকাটি অত্যন্ত জনবহুল হওয়ায় ফায়ার সার্ভিসের বড় গাড়ি ঢুকতে বেশ বেগ পেতে হয়। এছাড়া ভবনের ভেতরের সরু করিডোর ধোঁয়া আটকে রাখার জন্য অনেকটা ‘গ্যাস চেম্বারের’ মতো কাজ করেছে।






























































































































































































































































































































































