মেহেদি দিলেই কেন কারও কারও ত্বকে দেখা দেয় অ্যালার্জি?

ঈদ, বিয়ে কিংবা উৎসব—মেহেদি ছাড়া সাজ যেন অসম্পূর্ণ। তবে সৌন্দর্যের এই ঐতিহ্যবাহী উপকরণই অনেকের জন্য হয়ে উঠতে পারে অস্বস্তি ও স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেহেদি ব্যবহারের পর কারও কারও ত্বকে চুলকানি, ফুসকুড়ি, জ্বালাপোড়া এমনকি গুরুতর অ্যালার্জির মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে। সচেতনতা ও সঠিক পদ্ধতি মেনে চললে এসব ঝুঁকি অনেকটাই এড়ানো সম্ভব।

চিকিৎসকদের মতে, প্রাকৃতিক মেহেদি সাধারণত নিরাপদ হলেও বর্তমানে বাজারে পাওয়া অনেক “ইনস্ট্যান্ট” বা “ব্ল্যাক হেনা” পণ্যে রাসায়নিক উপাদান মেশানো হয়। বিশেষ করে প্যারাফেনাইলেনডায়ামিন (পিপিডি) নামের এক ধরনের রাসায়নিক দ্রুত গাঢ় রং আনার জন্য ব্যবহার করা হয়, যা ত্বকের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর হতে পারে। এই উপাদান থেকেই অধিকাংশ অ্যালার্জির ঘটনা ঘটে।

ত্বক বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, কারও শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা অতিসংবেদনশীল হলে মেহেদির নির্দিষ্ট উপাদানকে “ক্ষতিকর” হিসেবে চিহ্নিত করে প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। ফলে হাতে বা পায়ে মেহেদি দেওয়ার কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিনের মধ্যেই লালচে দাগ, ফোলাভাব, পানি ভর্তি ফুসকুড়ি কিংবা তীব্র চুলকানি শুরু হতে পারে। কারও ক্ষেত্রে ত্বক কালচে হয়ে যাওয়ার মতো দীর্ঘমেয়াদি সমস্যাও দেখা দেয়।

শুধু রাসায়নিক নয়, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশেও ঝুঁকি বাড়ে। অনেক সময় রাস্তার পাশের দোকান বা অস্থায়ী স্টলে ব্যবহৃত কোনে জীবাণু থাকতে পারে। একই কোন একাধিক মানুষের শরীরে ব্যবহার করলে সংক্রমণের আশঙ্কাও তৈরি হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যাদের আগে থেকেই একজিমা, অ্যালার্জি বা সংবেদনশীল ত্বকের সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে সতর্কতা আরও বেশি প্রয়োজন।

চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, মেহেদি ব্যবহারের আগে “প্যাচ টেস্ট” করা জরুরি। অর্থাৎ হাতে বা কানের পেছনে সামান্য মেহেদি লাগিয়ে ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কোনো ধরনের জ্বালা বা ফুসকুড়ি না হলে তা ব্যবহার তুলনামূলক নিরাপদ ধরা যায়। এছাড়া উপাদানের তালিকা দেখে রাসায়নিকমুক্ত বা প্রাকৃতিক মেহেদি বেছে নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

সমস্যা দেখা দিলে কী করবেন—এ প্রশ্নও এখন গুরুত্বপূর্ণ। ত্বকে জ্বালাপোড়া শুরু হলে প্রথমেই আক্রান্ত স্থান পরিষ্কার ঠান্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে। এরপর মেহেদি সম্পূর্ণ তুলে ফেলা জরুরি। অ্যালার্জি কমাতে চিকিৎসকের পরামর্শে অ্যান্টিহিস্টামিন বা স্টেরয়েডজাতীয় ক্রিম ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে নিজে থেকে ওষুধ ব্যবহার না করাই ভালো। কারণ ভুল চিকিৎসায় সংক্রমণ বা দাগ আরও বাড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। কারণ তাদের ত্বক নরম ও সংবেদনশীল। তাই শিশুদের হাতে ব্ল্যাক হেনা ব্যবহার না করার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন, যদিও প্রাকৃতিক মেহেদি সাধারণত নিরাপদ হিসেবে বিবেচিত হয়।

গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য

  • ব্ল্যাক হেনায় থাকা পিপিডি ত্বকের মারাত্মক অ্যালার্জির কারণ হতে পারে
  • অ্যালার্জির লক্ষণ কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিন পরেও দেখা দিতে পারে
  • সংবেদনশীল ত্বক ও একজিমা আক্রান্তদের ঝুঁকি বেশি
  • ব্যবহারের আগে প্যাচ টেস্ট করলে ঝুঁকি কমে
  • সমস্যা হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেহেদি আমাদের সংস্কৃতি ও উৎসবের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে সাময়িক সৌন্দর্যের জন্য অজানা রাসায়নিক ব্যবহার ভবিষ্যতে দীর্ঘমেয়াদি ত্বকের ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই সচেতনতা, নিরাপদ পণ্য নির্বাচন এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাই হতে পারে নিরাপদ সৌন্দর্যের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *