জাতীয় পার্টি (জাপা) বর্তমানে তীব্র অভ্যন্তরীণ সংকট ও নেতৃত্বের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। দলের চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অসন্তোষ প্রকাশ পাচ্ছে, এবং দলের একটি অংশ বিকল্প নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। এই পরিস্থিতি দলের মধ্যে নতুন করে বিভক্তির সৃষ্টি করেছে, যা নেতাকর্মীদের মধ্যে অস্বস্তি বাড়াচ্ছে। দলটির উপর নিষেধাজ্ঞার শঙ্কা এবং আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
জিএম কাদেরের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে দলের শীর্ষ নেতারা, বিশেষ করে কো-চেয়ারম্যান আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এবং এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার, চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন। তারা চেয়ারম্যান ও মহাসচিব পদে নিজেদের প্রার্থী করার ঘোষণা দিয়েছিলেন, যদিও পরে এই অবস্থান থেকে সরে আসেন। জিএম কাদের ২৮ জুন ২০২৫-এর জন্য কাউন্সিল আহ্বান করেছিলেন, কিন্তু চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র ভেন্যু হিসেবে না পাওয়ায় এটি স্থগিত করা হয়। দলের কিছু নেতা অভিযোগ করেছেন, কাউন্সিল বাতিলের পেছনে জিএম কাদেরের নিজের পদ ধরে রাখার ভয় কাজ করেছে। তারা দাবি করেন, কাকরাইলে দলীয় কার্যালয়ে কাউন্সিল আয়োজনের সিদ্ধান্ত থাকলেও তা বাতিল করা হয়েছে।
দলের কিছু নেতা গঠনতন্ত্রের ২০(১)(ক) ধারা বাতিলের দাবি তুলেছেন, যা চেয়ারম্যানকে কারণ ছাড়াই কাউকে বহিষ্কারের ক্ষমতা দেয়। এই ধারাকে তারা ‘স্বৈরাচারী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এই দাবিতে রওশন এরশাদপন্থী নেতারা, যেমন কাজী ফিরোজ রশীদ, আবু হোসেন বাবলা এবং কাজী মামুনুর রশীদ যুক্ত হয়েছেন।
আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনামলে জাতীয় পার্টি সরকারের সঙ্গে জোট বা সমঝোতার মাধ্যমে সুবিধাবাদী ভূমিকা পালন করেছে। এর ফলে দলটি ‘গৃহপালিত বিরোধী’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জাতীয় পার্টির বিরুদ্ধে ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ হিসেবে অভিযোগ ওঠে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) দলটির নিষিদ্ধকরণ এবং নেতাদের বিচারের দাবি তুলেছে। জিএম কাদেরের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে, এবং দলীয় কর্মসূচিতে অংশ নিতে গিয়ে তিনি বাধার সম্মুখীন হয়েছেন। দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে হামলা, নেতাকর্মীদের উপর মবের আক্রমণ এবং বিভিন্ন স্থানে মামলার ঘটনা দলটির অবস্থাকে আরও শোচনীয় করেছে।
২০২৪ সালে তৃণমূলের মতামত উপেক্ষা করে নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত দলের জন্য ক্ষতিকর হয়েছে বলে নেতাকর্মীরা মনে করেন। তারা বিশ্বাস করেন, জিএম কাদের শক্ত অবস্থান নিলে আওয়ামী লীগের উপর চাপ সৃষ্টি হতো এবং জাতীয় পার্টি ‘জাতীয় বীর’ হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পেত। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ জাতীয় পার্টি এবং ১৪ দলীয় জোটের নেতাকর্মীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণে বাধা দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। এটি দলের ভবিষ্যৎ অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
ঐতিহাসিকভাবে, জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার কারণে জনগণের আস্থা হারিয়েছে। ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে বড় দলগুলোর বর্জন এবং ২০১৮ ও ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে অংশ নেয়ায় দলটির গ্রহণযোগ্যতা কমেছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর জাতীয় পার্টি কার্যত কোনো কর্মসূচি পালন করতে পারছে না। রমজানে ইফতার মাহফিল এবং ফিলিস্তিনের পক্ষে মিছিলের চেষ্টাও বাধার মুখে পড়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং এনসিপি’র নেতারা জাতীয় পার্টিকে আওয়ামী লীগের ‘ফ্যাসিস্ট’ শাসনের সহযোগী হিসেবে বিচারের দাবি তুলেছেন। এটি দলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা তৈরি করেছে।

























































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































