সংসদ সদস্য ও 'জাতীয় সনদ', দ্বৈত শপথ জামায়াতের

এক ঐতিহাসিক রাজনৈতিক আবহে আজ শেরেবাংলা নগরের জাতীয় সংসদ ভবনে সম্পন্ন হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিজয়ীদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান। নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের এই আনুষ্ঠানিক যাত্রায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

দলের নির্বাচিত সকল প্রতিনিধি আজ দুটি পৃথক শপথ গ্রহণ করেছেন—একটি সংবিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্য হিসেবে, অন্যটি ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নের অঙ্গীকারে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন তাদের এই দ্বৈত শপথ বাক্য পাঠ করান।

শপথের মাহেন্দ্রক্ষণ: রেওয়াজ ও বাস্তবতা

মঙ্গলবার সকাল থেকেই সংসদ ভবন এলাকা ছিল উৎসবমুখর। কড়া নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা সংসদ চত্বরে একে একে উপস্থিত হন নবনির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা। সংসদীয় রেওয়াজ অনুযায়ী, সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সংসদ সদস্যরা প্রথমে শপথ গ্রহণ করেন। এরপরই শপথ কক্ষে প্রবেশ করেন জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচিত ৬৮ জন সংসদ সদস্য।

এবারের শপথ অনুষ্ঠানটি ছিল গতানুগতিক ধারার চেয়ে ভিন্ন। প্রথাগতভাবে কেবল সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার বিধান থাকলেও, জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বা রাষ্ট্র সংস্কারের মূলনীতিগুলো মেনে চলার জন্য অতিরিক্ত একটি শপথের ব্যবস্থা রাখা হয়। জামায়াতের সংসদ সদস্যরা অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে এই প্রক্রিয়ায় অংশ নেন, যা উপস্থিত পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

দ্বৈত শপথের তাৎপর্য ও রাজনৈতিক বার্তা

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতে ইসলামীর এই দ্বৈত শপথ গ্রহণ কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি একটি গভীর রাজনৈতিক বার্তা। ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ হলো সেই চাবিকাঠি যার মাধ্যমে রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো সংস্কারের স্বপ্ন দেখছে ছাত্র-জনতা। জামায়াত এই সনদে স্বাক্ষর এবং শপথ নেওয়ার মাধ্যমে স্পষ্ট করল যে, তারা কেবল ক্ষমতার অংশীদার হতে নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সংস্কারের প্রশ্নে আপসহীন থাকতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

শপথ গ্রহণ শেষে সংবাদমাধ্যমের সাথে আলাপকালে জামায়াতের আমির ও নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “আমরা জনগণের আমানত রক্ষা এবং জুলাই বিপ্লবের শহীদদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ। সংসদ সদস্য হিসেবে আমাদের দায়িত্ব যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়ন করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। আমরা একটি বৈষম্যহীন ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ গঠনে কাজ করে যাব।”

ত্রয়োদশ সংসদের এই চিত্র বলে দিচ্ছে, দেশের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আসছে। বিএনপি ও জামায়াতের এই সম্মিলিত অবস্থান সংসদকে প্রাণবন্ত করে তুলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে জামায়াতের মতো একটি ক্যাডারভিত্তিক দল যখন রাষ্ট্রীয় সংস্কারের সনদে প্রকাশ্য শপথ নেয়, তখন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা বহুগুণ বেড়ে যায়।

বিকেলে মন্ত্রিপরিষদের শপথের মধ্য দিয়ে এই রাজনৈতিক পরিক্রমা পূর্ণতা পাবে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছ থেকে ম্যান্ডেট বুঝে নিয়ে রাজনৈতিক সরকারগুলো কীভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *