বৃহস্পতিবার দুপুরে আহমেদাবাদের সরদার বল্লভভাই পটেল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে লন্ডনের গ্যাটউইক বিমানবন্দরের উদ্দেশে যাত্রা করা এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইট এআই১৭১, একটি বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার, উড্ডয়নের কয়েক সেকেন্ড পরই বিধ্বস্ত হয়। বিমানটিতে ২৩০ জন যাত্রী ও ১২ জন ক্রু সদস্য ছিলেন, মোট ২৪২ জন। এয়ার ইন্ডিয়া নিশ্চিত করেছে, এই দুর্ঘটনায় ২৪১ জন নিহত হয়েছেন, এবং একমাত্র বেঁচে যাওয়া ব্যক্তি হলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক বিষ্ণু কুমার রমেশ (৪০)।
বিষ্ণু কুমার রমেশ, যিনি যুক্তরাজ্যের লেস্টারের বাসিন্দা, বিমানের ১১এ আসনে বসেছিলেন, যা জরুরি প্রস্থান দরজার কাছে ছিল। তিনি হিন্দুস্তান টাইমসকে বলেন, “উড্ডয়নের ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে একটি বিকট শব্দ হলো, এবং বিমানটি বিধ্বস্ত হলো। সবকিছু খুব দ্রুত ঘটে গেল।” তিনি জানান, উড্ডয়নের পর বিমানটি যেন আটকে গিয়েছিল, এবং সবুজ ও সাদা আলো জ্বলতে শুরু করে। বিমানটি আহমেদাবাদের মেঘানি নগরের বিজে মেডিকেল কলেজের হোস্টেলে আছড়ে পড়ে, যার ফলে সেখানেও বেশ কয়েকজন নিহত হন।
রমেশ বলেন, “আমার পাশের দরজা ভেঙে যাওয়ায় একটি ফাঁকা জায়গা দেখতে পেলাম। আমি সিটবেল্ট খুলে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলাম। আমার মনে হয়, আমি যে পাশে ছিলাম, সেটি হোস্টেলের দিকে ছিল না এবং মাটির কাছাকাছি ছিল।” সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, রক্তমাখা টি-শার্ট পরা রমেশ পা টেনে টেনে অ্যাম্বুলেন্সের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। তিনি জানান, তাঁর বাঁ হাতে পোড়া ক্ষত ও শরীরে একাধিক আঘাত রয়েছে, তবে তিনি বিপদমুক্ত।
দুর্ঘটনার বিবরণ: বিমানটি দুপুর ১:৩৮ মিনিটে (ভারতীয় সময়) রানওয়ে ২৩ থেকে উড্ডয়ন করে এবং ৩২ সেকেন্ড পর মেডায় কল জারি করে। এরপর এটি মেঘানি নগরের একটি আবাসিক এলাকায় বিধ্বস্ত হয়, যেখানে প্রচুর জ্বালানির কারণে তীব্র আগুন ছড়িয়ে পড়ে। এয়ার ইন্ডিয়া জানায়, বিমানে ১৬৯ জন ভারতীয়, ৫৩ জন ব্রিটিশ, ৭ জন পর্তুগিজ এবং ১ জন কানাডীয় নাগরিক ছিলেন।
মোট মৃতের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। আহমেদাবাদ পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিশাখা দাবরাল জানান, এ পর্যন্ত ২৬৯টি মৃতদেহ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে, তবে সঠিক সংখ্যা নির্ধারণে সময় লাগবে। বিমানের আরোহীদের পাশাপাশি হোস্টেলে থাকা অন্তত ২৮ জন নিহত হয়েছেন। ফেডারেশন অব অল ইন্ডিয়া মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন জানায়, ৫০-৬০ জন মেডিকেল ছাত্র আহত হয়েছেন।
ভারতের বিমান দুর্ঘটনা তদন্ত ব্যুরো (এএআইবি) তদন্ত শুরু করেছে। দুটি ব্ল্যাক বক্সের একটি উদ্ধার করা হয়েছে, যা তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ভারতের বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয় এয়ার ইন্ডিয়ার বোয়িং ৭৮৭-৮/৯ ফ্লিটের জিই এরোস্পেস জিইএনএক্স ইঞ্জিনে অতিরিক্ত রক্ষণাবেক্ষণ পরীক্ষার নির্দেশ দিয়েছে। মার্কিন ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্টেশন সেফটি বোর্ড (এনটিএসবি) এবং ব্রিটেনের এয়ার অ্যাক্সিডেন্টস ইনভেস্টিগেশন ব্রাঞ্চ তদন্তে সহায়তা করবে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং হাসপাতালে বিষ্ণু কুমার রমেশের সঙ্গে দেখা করেন। তিনি এক্স-এ লেখেন, “আহমেদাবাদের ট্র্যাজেডি হৃদয়বিদারক।” ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শোক প্রকাশ করেছেন এবং তদন্তে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
এটি বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনারের প্রথম মারাত্মক দুর্ঘটনা, যা ২০১১ সাল থেকে বাণিজ্যিকভাবে চলছে। এর আগে এই মডেলের কোনো “হাল লস” ঘটনা রেকর্ড করা হয়নি। তবে, ২০২৪ সালে একজন বোয়িং হুইসেলব্লোয়ার, স্যাম সালেহপুর, দাবি করেছিলেন যে ৭৮৭-এর ফিউজলেজের অংশগুলো সঠিকভাবে সংযুক্ত না হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদে বিপদ হতে পারে, যদিও বোয়িং এই অভিযোগ অস্বীকার করে।
এই দুর্ঘটনা ভারতের সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে মারাত্মক বিমান দুর্ঘটনাগুলোর একটি। বিষ্ণু কুমার রমেশের অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া এই ট্র্যাজেডির মধ্যে একটি আশার আলো। তবে, তাঁর ভাই অজয় কুমার রমেশসহ অন্যান্য আরোহীদের হারানোর শোক তাঁকে তাড়া করছে। তদন্তের ফলাফল এই দুর্ঘটনার কারণ উদঘাটন করবে, যা ভবিষ্যতে বিমান নিরাপত্তা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।













































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































