ভারতের ‘অপারেশন সিঁদুর’ এবং পাকিস্তানের পাল্টা ‘অপারেশন বুনিয়ানুম মারসুস’ নিয়ে উত্তেজনা এখনো অব্যাহত। পাকিস্তানের তীব্র প্রতিক্রিয়া এবং ভারতের কথিত ক্ষয়ক্ষতির দাবি নিয়ে উভয় দেশের মধ্যে তথ্যযুদ্ধ তুঙ্গে। তবে, এই সংঘাতের বিশ্লেষণে ভারতীয় সমরবিদ প্রভিন সনির মতামত এবং দুই পক্ষের দাবি-পাল্টা দাবির মধ্যে বাস্তবতা খুঁজে পাওয়া জরুরি। নিচে এই সংঘাতের বিভিন্ন দিক, দাবি এবং প্রভিন সনির বিশ্লেষণের সমালোচনামূলক পর্যালোচনা তুলে ধরা হলো।
ভারত ৭ মে ২০২৫ ভোরে ‘অপারেশন সিঁদুর’ পরিচালনা করে, যাতে পাকিস্তান ও পাক-অধিকৃত জম্মু-কাশ্মীরে (পিওজেকে) নয়টি সন্ত্রাসী ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি দাবি করেন, এই হামলা ছিল “যথাযথ, সংযত এবং অ-উসকানিমূলক,” যা জইশ-ই-মোহাম্মদ (জেইএম), লস্কর-ই-তাইয়েবা (এলইটি) এবং হিজবুল মুজাহিদিনের সন্ত্রাসী অবকাঠামো ধ্বংসের জন্য পরিচালিত হয়। এই অভিযান ২২ এপ্রিল পহেলগাঁও হামলার প্রতিশোধ হিসেবে পরিচালিত হয়, যেখানে ২৫ ভারতীয় ও এক নেপালি নাগরিক নিহত হন। ভারত দাবি করে, কোনো পাকিস্তানি সামরিক বা বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করা হয়নি এবং হামলায় প্রায় ১০০ সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে।
পাকিস্তান অপারেশন সিঁদুরকে “যুদ্ধের কাজ” হিসেবে আখ্যায়িত করে এবং দাবি করে যে, ভারতের হামলায় ৩১ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে নারী ও শিশুও ছিল। পাকিস্তানের সামরিক মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী দাবি করেন, ভারত পাঞ্জাবের ভাওয়ালপুর, কোটলি এবং মুজাফফরাবাদে ছয়টি স্থানে হামলা চালায়, যার মধ্যে মসজিদও ছিল। পাকিস্তান আরও দাবি করে, তারা ভারতের পাঁচটি যুদ্ধবিমান, যার মধ্যে রাফায়েলও ছিল, ভূপাতিত করেছে।
১০ মে পাকিস্তান ‘অপারেশন বুনিয়ানুম মারসুস’ শুরু করে, যার নাম কুরআনের একটি আয়াত থেকে নেওয়া, যার অর্থ “শক্ত ও সুসংহত কাঠামো”। এই অভিযানে পাকিস্তান শত শত ড্রোন ও মিসাইল ব্যবহার করে ভারতের পাঠানকোট, উধমপুর, গুজরাট, রাজস্থানের বিমানঘাঁটি, ব্রাহ্মস মিসাইল স্টোরেজ, ব্রিগেড সদর দপ্তর এবং উরির সরবরাহ ডিপোতে হামলা চালায়। পাকিস্তান দাবি করে, এই হামলায় ভারত ৫০ জনের বেশি সেনা হারায় এবং এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমসহ বেশ কয়েকটি সামরিক পোস্ট ধ্বংস হয়।
১০ মে ভারত ও পাকিস্তান একটি “দ্বিপাক্ষিক বোঝাপড়া” ঘোষণা করে, যা যুদ্ধবিরতি হিসেবে কার্যকর হয়। তবে, ভারত স্পষ্ট করে যে এটি কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি নয়। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতার কথা উভয় পক্ষই অস্বীকার করলেও, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার নিশ্চিত করেন যে, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় দেশ এই যুদ্ধবিরতি স্থায়ী করতে ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। এই পরিস্থিতি ১৯৯৯ সালের কারগিল যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল।
ভারতের বিশিষ্ট সমরবিদ এবং ফোর্স ম্যাগাজিনের সম্পাদক প্রভিন সনি তার ইউটিউব চ্যানেলে অপারেশন সিঁদুর নিয়ে একটি বিশ্লেষণ প্রকাশ করেন, যা ভারতে ব্লক করা হয়। তিনি দাবি করেন, ভারতীয় বিমান বাহিনী সীমান্ত অতিক্রম না করেই হামলা চালায়, তবে জম্মু-কাশ্মীর ও পাঞ্জাবে চারটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়। তিনি এই ঘটনাগুলোকে “দুর্ঘটনা” হিসেবে উল্লেখ করলেও পাকিস্তানের দাবির সঙ্গে সংযোগ ঘটান। সনি ভারতের নিরাপত্তা নীতি এবং সামরিক কৌশল নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, অপারেশন সিঁদুর ভারতীয় বিমান বাহিনীর সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করেছে এবং দেশটির প্রতিরোধ ক্ষমতা (deterrence) কমিয়েছে। তিনি ২০১৯ সালের ‘অপারেশন বান্দার’ উল্লেখ করে বলেন, পাকিস্তানের ‘অপারেশন সুইফট রিটর্ট’ ভারতকে বিপাকে ফেলেছিল, এবং এবারও একই ঘটনা ঘটেছে।
পাকিস্তান দাবি করে, অপারেশন বুনিয়ানুম মারসুসে ভারত ৫০ জনের বেশি সেনা হারিয়েছে এবং এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে, ভারতীয় সূত্রে বলা হয়, পাকিস্তানের ড্রোন ও মিসাইল হামলা বেশিরভাগই এস-৪০০, এল-৭০ গান এবং অন্যান্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় প্রতিহত করা হয়েছে। জম্মু, পাঠানকোট এবং উধমপুরে পাকিস্তানের হামলা ব্যর্থ হয় এবং কোনো বড় ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। তবে, পাকিস্তানের শেলিংয়ে জম্মু-কাশ্মীরে কিছু বেসামরিক ও সামরিক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে একজন সিনিয়র সরকারি কর্মকর্তা নিহত এবং কয়েকজন আহত হয়েছেন।
প্রভিন সনি এবং ভারতের কিছু সমালোচক অপারেশন সিঁদুরের কৌশলগত উদ্দেশ্য এবং ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা মনে করেন, ভারতের সামরিক পদক্ষেপ পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে, যা অঞ্চলটিকে আরও অস্থিতিশীল করেছে। তবে, ভারতীয় সরকার এবং সামরিক বাহিনী দাবি করে, অপারেশন সিঁদুর সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে একটি জরুরি এবং সফল পদক্ষেপ ছিল, যা পহেলগাঁও হামলার প্রতিশোধ নিয়েছে এবং ভবিষ্যৎ হামলা প্রতিরোধে সন্ত্রাসী অবকাঠামো ধ্বংস করেছে।
এই সংঘাতে উভয় পক্ষের দাবি অতিরঞ্জিত বলে মনে হচ্ছে। পাকিস্তানের দাবি করা ভারতীয় যুদ্ধবিমান ধ্বংস এবং বড় ক্ষয়ক্ষতির তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। একইভাবে, ভারতের দাবি করা ১০০ সন্ত্রাসী নিহতের তথ্যও পাকিস্তান অস্বীকার করেছে। প্রভিন সনির বিশ্লেষণ ভারতের সামরিক কৌশলের দুর্বলতা তুলে ধরলেও, তিনি পাকিস্তানের সামরিক প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি বা তাদের কৌশলগত সীমাবদ্ধতা বিশ্লেষণ করেননি। উদাহরণস্বরূপ, পাকিস্তানের ড্রোন হামলা ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ব্যর্থ হয়েছে, যা পাকিস্তানের আক্রমণ ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়া ভারতের জন্য “লজ্জাজনক” বলে প্রচার করা হলেও, এটি আসলে উভয় পক্ষের জন্যই একটি কৌশলগত পশ্চাদপসরণ। ভারত এবং পাকিস্তান, দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশ হিসেবে, একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের ঝুঁকি এড়াতে চেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এখানে কূটনৈতিক চাপের মাধ্যমে উত্তেজনা কমানোর জন্য ছিল, যা কারগিল যুদ্ধের সঙ্গে তুলনীয় নয়, কারণ বর্তমান সংঘাত অনেক কম সময়ের এবং সীমিত পরিসরে সংঘটিত হয়েছে।






































































































































































































































































































































































































































































































































































































































