চীন-পাকিস্তান-বাংলাদেশ-ভারতের-newsedge4

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক গতিশীলতা দ্রুত পরিবর্তনশীল। চীন, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা ভারতের জন্য উল্লেখযোগ্য নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি করছে। ২০২৫ সালে এই সম্পর্কের গভীরতা এবং এর প্রভাব দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা নীতির উপর কীভাবে প্রভাব ফেলছে, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে আলোচনা তুঙ্গে। এই প্রতিবেদনে আমরা এই কৌশলগত ঘনিষ্ঠতার বিভিন্ন দিক এবং ভারতের উদ্বেগের কারণগুলো বিশ্লেষণ করব।

চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্ক প্রাচীনকাল থেকেই বিদ্যমান, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই সম্পর্ক কৌশলগত অংশীদারিত্বের রূপ নিয়েছে। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)-এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশে পদ্মা সেতু, চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর উন্নয়ন এবং বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে চীন বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ২০২৫ সালে চীন বাংলাদেশের ৯৭% পণ্যের উপর শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার প্রদান করেছে, যা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের ভূ-কৌশলগত অবস্থান, বিশেষ করে ভারত মহাসাগরের প্রবেশদ্বার হিসেবে, চীনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ভারত এর জন্য উদ্বেগের কারণ, কারণ এটি ভারতের আঞ্চলিক প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করছে।

চীন-পাকিস্তান ঘনিষ্ঠতা: সিপিইসি এবং সামরিক সহযোগিতা

চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (সিপিইসি) চীন ও পাকিস্তানের সম্পর্কের মূল ভিত্তি। এই প্রকল্পের মাধ্যমে পাকিস্তানের গদর বন্দরকে চীনের জিনজিয়াং প্রদেশের সঙ্গে সংযুক্ত করা হচ্ছে, যা চীনের জন্য আরব সাগরে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করছে। ২০২৫ সালে ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে চীন পাকিস্তানকে উন্নত বিভিআর ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করেছে, যা ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগকে আরও তীব্র করেছে।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়ায় চীন-পাকিস্তান যৌথ সামরিক মহড়া ভারতের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই মহড়া সন্ত্রাসবাদবিরোধী অভিযানের নামে হলেও, ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি আঞ্চলিক শক্তি ভারসাম্যে চীনের প্রভাব বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।

ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ

ভারতের জন্য চীন-পাকিস্তান-বাংলাদেশ ত্রিদেশীয় সম্পর্কের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা একাধিক কারণে উদ্বেগজনক:

  • আঞ্চলিক প্রভাব হ্রাস: চীনের অর্থনৈতিক ও সামরিক বিনিয়োগ বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে ভারতের প্রভাবকে কমিয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশে চীনের গভীর সমুদ্র বন্দর প্রকল্প এবং পাকিস্তানে সিপিইসি ভারতের ভূ-কৌশলগত স্বার্থের জন্য হুমকি।
  • মিয়ানমারের অস্থিতিশীলতা: মিয়ানমারের রাখাইনে আরাকান আর্মির সাম্প্রতিক সাফল্য ভারত ও চীন উভয়ের জন্য উদ্বেগ তৈরি করেছে। তবে, কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, এটি চীনের জন্য নতুন কৌশলগত সুযোগ তৈরি করতে পারে, যা দেশটির জন্য অসুবিধাজনক।
  • সামরিক হুমকি: চীনের পাকিস্তানকে অস্ত্র সরবরাহ এবং বাংলাদেশের নৌবাহিনীতে সাবমেরিন সরবরাহ ভারতের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বকে চ্যালেঞ্জ করছে।

বাংলাদেশ চীন ও ভারত উভয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছে। পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন জানিয়েছেন, বাংলাদেশকে ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। তবে, চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগের মধ্যে বাংলাদেশের জন্য এই ভারসাম্য রক্ষা করা ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে।

২০২৪ সালে শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা চীনের জন্য সুযোগ এবং ঝুঁকি উভয়ই তৈরি করেছে। চীন বাংলাদেশের স্থিতিশীলতার উপর গুরুত্ব দিচ্ছে, কারণ অস্থিরতা তাদের বিনিয়োগের জন্য হুমকি। চীন, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের মধ্যে কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক গতিশীলতাকে নতুন রূপ দিচ্ছে। ভারতের জন্য এটি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করলেও, বাংলাদেশের ভূ-কৌশলগত অবস্থান এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এই অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *