মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ: সংঘাত থামাতে এবার মাঠে নামছে চীন

ইরানের মাটিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলাকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে বিশ্ব রাজনীতি। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ঘনঘটা, তখন নীরবতা ভেঙে কড়া বার্তা দিল বেইজিং। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই স্পষ্ট জানিয়েছেন, বেইজিং কেবল কাগুজে বিবৃতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত বন্ধে সরাসরি কূটনৈতিক তৎপরতা চালাবে তার দেশ।


বেইজিংয়ের কড়া অবস্থান: যুদ্ধের কোনো যৌক্তিকতা নেই

বুধবার বেইজিংয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূতের সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে মিলিত হন চীনের প্রভাবশালী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই। সেখানে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ওয়াং ই অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ইরান ও এই অঞ্চলে যা ঘটছে, তা কখনোই শুরু হওয়া উচিত ছিল না। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপকে তিনি অপ্রয়োজনীয় এবং উসকানিমূলক হিসেবে অভিহিত করেছেন।

চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মতে, বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় কোনো সমস্যার সমাধান যুদ্ধ দিয়ে সম্ভব নয়। তিনি উল্লেখ করেন যে, এই সংঘাত অব্যাহত রাখার পেছনে কোনো বাস্তবসম্মত বা নৈতিক কারণ নেই। চীনের এই অবস্থান সরাসরি ওয়াশিংটন এবং তেল আবিবের জন্য একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক চাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

‘বিবৃতি থেকে অ্যাকশনে’ চীনের রূপান্তর

দীর্ঘদিন ধরেই চীনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল যে, তারা আন্তর্জাতিক সংকটে কেবল সমবেদনা বা নিন্দা জানিয়েই দায় সারে। কিন্তু এবার সেই খোলস থেকে বেরিয়ে আসার ইঙ্গিত দিলেন ওয়াং ই। তিনি বলেন, চীন এখন সংঘাত নিরসনে একটি ‘সক্রিয় মধ্যস্থতাকারী’র ভূমিকা পালন করতে চায়। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে চীনের ক্রমবর্ধমান সুসম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে তারা একটি শান্তি আলোচনা শুরু করার কথা ভাবছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, চীন মনে করে এই সংকট ছড়িয়ে পড়লে তা কেবল আঞ্চলিক নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দূতের সঙ্গে আলাপকালে ওয়াং ই আরব বিশ্বের দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান এবং প্রতিশ্রুতি দেন যে বেইজিং তাদের পাশে থাকবে।


বৈঠকে আলোচিত মূল পয়েন্টসমূহ:

  • সংঘাতের বিরোধিতা: ইরানজুড়ে পরিচালিত সামরিক অভিযানের ঘোর বিরোধিতা করেছে বেইজিং।

  • যৌক্তিকতাহীন যুদ্ধ: চীনের মতে, এই সংঘাত প্রলম্বিত করার কোনো বৈধ প্রেক্ষাপট অবশিষ্ট নেই।

  • কূটনৈতিক সক্রিয়তা: কেবল মৌখিক নিন্দা নয়, চীন এখন সরাসরি মধ্যস্থতায় আগ্রহী।

  • আঞ্চলিক ঐক্য: আরব দেশগুলোর সঙ্গে মিলে একটি সম্মিলিত শান্তি কাঠামো তৈরির প্রস্তাব।

  • অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা: যুদ্ধের ফলে তেলের বাজারে অস্থিরতা রোধে বেইজিংয়ের বিশেষ নজর।


ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ ও ভবিষ্যৎ প্রভাব

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে ঐতিহাসিক সমঝোতা করিয়ে দেওয়ার পর চীন এখন মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করতে চায়। ওয়াশিংটন যখন সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে, বেইজিং তখন শান্তির দূত সেজে আরব বিশ্বের মন জয় করতে চাইছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দূতের সঙ্গে এই বৈঠকটি অত্যন্ত কৌশলগত। কারণ আমিরাত এ অঞ্চলে মার্কিন ও চীনা—উভয় ব্লকের সঙ্গেই ঘনিষ্ঠ।

চীনের এই কঠোর অবস্থানের পর হোয়াইট হাউস বা ইসরায়েলের পক্ষ থেকে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে বেইজিংয়ের এই ‘কূটনৈতিক প্রচেষ্টা’ যদি সফল হয়, তবে বিশ্ব রাজনীতিতে মার্কিন আধিপত্যের ওপর তা বড় ধরনের আঘাত হবে। বিশেষ করে ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা অগ্রাহ্য করে চীনের সঙ্গে তেহরানের যে কৌশলগত অংশীদারিত্ব রয়েছে, তা এই সংকটে নতুন মাত্রা যোগ করছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *