চীনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিংয়ে ১৯ জুন, ২০২৫ তারিখে অনুষ্ঠিত পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের প্রথম ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে চীন, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান নতুন একটি সহযোগিতার কাঠামো গঠন করেছে। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিল্প, সমুদ্রবিষয়ক, পানিসম্পদ, কৃষি, জলবায়ু পরিবর্তন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, যুব সম্পৃক্ততা, সংস্কৃতি ও চিন্তন প্রতিষ্ঠানের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা জোরদার করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তিন দেশ।
বৈঠকে চীনের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সান ওয়েইডং, বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রসচিব রুহুল আলম সিদ্দিকী এবং পাকিস্তানের অতিরিক্ত সচিব (এশিয়া-প্যাসিফিক) ইমরান আহমেদ সিদ্দিকী সশরীরে অংশ নেন। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রসচিব আমনা বালুচ বৈঠকের প্রথম পর্বে ভিডিও লিংকের মাধ্যমে অংশগ্রহণ করেন। তিনি এই ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগের জন্য চীনের প্রশংসা করে বলেন, “চীন ত্রিপক্ষীয় প্রক্রিয়ার উদ্বোধনী বৈঠক আহ্বান করে ভালো কাজ করেছে।” তিনি জনকেন্দ্রিক উন্নয়নের জন্য তিন দেশের অভিন্ন আকাঙ্ক্ষার কথা উল্লেখ করে চীন ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে গভীর সম্পৃক্ততার জন্য পাকিস্তানের আগ্রহ প্রকাশ করেন।
বৈঠকের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, তিন দেশ “প্রতিবেশীসুলভ দৃষ্টিভঙ্গি, সমতা, পারস্পরিক বিশ্বাস, উন্মুক্ততা, অন্তর্ভুক্তি, অভিন্ন উন্নয়ন ও সবার সুফলের সহযোগিতা” নীতির ভিত্তিতে কাজ করবে। এই সহযোগিতা “বহুপক্ষীয়তা ও উন্মুক্ত আঞ্চলিকতাবাদের” ওপর ভিত্তি করে গঠিত এবং “কোনো তৃতীয় পক্ষের বিরুদ্ধে পরিচালিত নয়।”
সহযোগিতার ক্ষেত্র
তিন দেশ নিম্নলিখিত ক্ষেত্রে যৌথ প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্মত হয়েছে:
- বাণিজ্য ও শিল্প: অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার জন্য বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি।
- সমুদ্রবিষয়ক ও পানিসম্পদ: সমুদ্র ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা। …
- কৃষি ও জলবায়ু পরিবর্তন: কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা।
- স্বাস্থ্য ও শিক্ষা: স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার মান উন্নয়ন।
- যুব সম্পৃক্ততা ও সংস্কৃতি: যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে আদান-প্রদান ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতা।
- চিন্তন প্রতিষ্ঠান: গবেষণা ও নীতি সংলাপে সহযোগিতা।
এই উদ্যোগগুলো বাস্তবায়নের জন্য একটি ত্রিপক্ষীয় কর্মী গোষ্ঠী গঠন করা হবে।
এই ত্রিপক্ষীয় জোট চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI)-এর সঙ্গে সংযুক্ত, যা এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের মধ্যে বাণিজ্যিক ও অবকাঠামোগত সংযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে কাজ করছে। পাকিস্তান ও বাংলাদেশ উভয়ই BRI-এর গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। চীনের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সান ওয়েইডং জোর দিয়ে বলেন, এই সহযোগিতা তিন দেশের জনগণের স্বার্থে এবং আঞ্চলিক শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেছেন। ২০২৫ সালের মার্চে চীন সফরে তিনি বাংলাদেশকে চীনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অংশীদার হিসেবে বর্ণনা করেন এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের বাজারে প্রবেশের জন্য চীনের পক্ষে বাংলাদেশকে একটি গেটওয়ে হিসেবে প্রস্তাব করেন। এই কৌশলগত সিদ্ধান্ত ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
কুনমিংয়ে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের পাশাপাশি সান ওয়েইডং বাংলাদেশের রুহুল আলম সিদ্দিকী এবং পাকিস্তানের ইমরান আহমেদ সিদ্দিকীর সঙ্গে পৃথক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন। এছাড়া তিনি আফগানিস্তানের অন্তর্বর্তী তালেবান প্রশাসনের ভারপ্রাপ্ত উপপ্রধানমন্ত্রী হাজী মাওলাভি আবদুল সালাম হানাফির সঙ্গেও বৈঠক করেন, যা চীনের আঞ্চলিক কূটনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।
ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে এই ত্রিপক্ষীয় জোট উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ এটি চীনের BRI-এর মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বিস্তারের একটি কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশের তিস্তা নদী ও মংলা বন্দরের মতো স্পর্শকাতর অবকাঠামো প্রকল্পে চীনের বিনিয়োগ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কৌশলগত স্বার্থের জন্য হুমকি হিসেবে মনে করা হচ্ছে।
চীন-বাংলাদেশ-পাকিস্তান ত্রিপক্ষীয় জোট দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক গতিশীলতায় একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এই সহযোগিতা অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নত করার লক্ষ্যে গঠিত হলেও, এটি আঞ্চলিক শক্তি ভারসাম্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।






































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































