ইরানের ভূগর্ভস্থ ফোর্ডো পারমাণবিক স্থাপনা, যা কোমের কাছে পাহাড়ের গভীরে অবস্থিত, বিশ্বের সবচেয়ে সুরক্ষিত পারমাণবিক সাইটগুলোর একটি। পারমাণবিক পদার্থবিজ্ঞানী এবং ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটির প্রতিষ্ঠাতা ডেভিড অলব্রাইট বিবিসি রেডিও ৫ লাইভ ব্রেকফাস্টে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ফোর্ডো মাটির ৮০ মিটার (২৬২ ফুট) গভীরে অবস্থিত, যা এটিকে ধ্বংস করা অত্যন্ত কঠিন করে তুলেছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইসরাইলের চলমান হামলা এই স্থাপনাকে দীর্ঘ সময়ের জন্য অকার্যকর করতে পারে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের ৩০,০০০ পাউন্ডের জিবিইউ-৫৭ ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স পেনিট্রেটর (বাঙ্কার বাস্টার) বোমা এবং বি-২ স্টিলথ বোমারু বিমানের মাধ্যমে এটি পুরোপুরি ধ্বংস করা সম্ভব।
ফোর্ডো পারমাণবিক স্থাপনা ২০০০-এর দশকের শুরুতে ইরানের ‘ক্র্যাশ পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির’ অংশ হিসেবে নির্মিত হয়েছিল। এটি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের একটি ঘাঁটিতে অবস্থিত এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের জন্য উন্নত সেন্ট্রিফিউজ ব্যবহার করে। ২০২৩ সালের মার্চ মাসে, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) জানায়, ফোর্ডোতে ৮৩.৭% বিশুদ্ধতার ইউরেনিয়াম পাওয়া গেছে, যা পারমাণবিক অস্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয় ৯০% বিশুদ্ধতার খুব কাছাকাছি। অলব্রাইট উল্লেখ করেন, ফোর্ডো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও এটি একমাত্র স্থাপনা নয়, তাই এর গুরুত্ব অতিরঞ্জিত করা উচিত নয়।
ইসরাইল সম্প্রতি ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়েছে, যার মধ্যে নাটানজ এবং এসফাহানের স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে, ফোর্ডোতে উল্লেখযোগ্য ক্ষতির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আইএইএ প্রধান রাফায়েল গ্রসি জানিয়েছেন, ফোর্ডোতে কোনো বড় ধরনের ক্ষতি হয়নি, যদিও ইরানের কর্তৃপক্ষ কিছু হামলার কথা উল্লেখ করেছে। ফোর্ডোর গভীর ভূগর্ভস্থ অবস্থান এবং শক্তিশালী নির্মাণ এটিকে ইসরাইলের বর্তমান অস্ত্রশস্ত্রের জন্য প্রায় অভেদ্য করে তুলেছে। ইসরাইলের কাছে ফোর্ডো ধ্বংসের জন্য প্রয়োজনীয় বাঙ্কার বাস্টার বোমা বা ভারী বোমারু বিমান নেই।
অলব্রাইট পরামর্শ দিয়েছেন, ফোর্ডোর বিদ্যুৎ সরবরাহ বা বায়ুচলাচল ব্যবস্থার মতো সহায়ক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে এটিকে অকার্যকর করা সম্ভব। তিনি বলেন, ইসরাইল যদি ইরানের আকাশসীমায় আধিপত্য বজায় রাখে, তবে তারা ফোর্ডোকে ক্রমাগত অচল রাখতে পারে। তবে, পুরোপুরি ধ্বংসের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা প্রয়োজন, যাদের কাছে জিবিইউ-৫৭ বোমা এবং বি-২ বোমারু বিমান রয়েছে।
অলব্রাইট উল্লেখ করেন, ইরাকের অভিজ্ঞতা আইএইএ-কে গোপন পারমাণবিক কর্মসূচি অনুসন্ধানে দক্ষ করে তুলেছে। ফোর্ডোর মতো স্থাপনাগুলো আইএইএ-র নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছে। ২০২৫ সালের জুনে ইরানের বিরুদ্ধে আইএইএ-র ৩৫-জাতির বোর্ড অফ গভর্নরস ২০ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণ করে, কারণ ইরান ৬০% বিশুদ্ধতায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ অব্যাহত রেখেছে এবং আইএইএ-র তদন্তে সহযোগিতা করেনি। ফোর্ডোতে উন্নত আইআর-৬ সেন্ট্রিফিউজ ব্যবহার করা হচ্ছে, যা দ্রুত উচ্চ-বিশুদ্ধতার ইউরেনিয়াম উৎপাদন করতে সক্ষম।
ফোর্ডোর মতো স্থাপনায় হামলার ফলে তেজস্ক্রিয় দূষণের ঝুঁকি রয়েছে, যা ইরান এবং আশপাশের অঞ্চলের জন্য মারাত্মক হতে পারে। আইএইএ প্রধান গ্রসি সতর্ক করে বলেছেন, পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা মানুষ এবং পরিবেশের জন্য গুরুতর পরিণতি বয়ে আনতে পারে। অলব্রাইটের মতে, ফোর্ডো অক্ষত থাকলে এবং ইরানের কাছে ৬০% সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ থাকলে, তারা এক মাসের মধ্যে নয়টি পারমাণবিক অস্ত্রের জন্য পর্যাপ্ত ইউরেনিয়াম উৎপাদন করতে পারে।
ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে যে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে। ২০১৫ সালের জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অফ অ্যাকশন (জেসিপিওএ) চুক্তির আওতায় ফোর্ডোর সেন্ট্রিফিউজ এবং পারমাণবিক উপকরণ সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তি থেকে সরে আসার পর ইরান ফোর্ডোতে সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম পুনরায় শুরু করে। ইরানের পারমাণবিক প্রধান মোহাম্মদ এসলামি সম্প্রতি জানিয়েছেন, ফোর্ডোতে প্রথম প্রজন্মের সেন্ট্রিফিউজের পরিবর্তে উন্নত ষষ্ঠ প্রজন্মের মেশিন স্থাপন করা হবে।
ইসরাইল ফোর্ডো ধ্বংসের জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনা বিবেচনা করছে, যার মধ্যে রয়েছে স্পেশাল ফোর্সের মাধ্যমে স্থাপনার প্রবেশপথ ধ্বংস বা সাইবার হামলা। ইসরাইলের রাষ্ট্রদূত ইয়েচিয়েল লেইটার বলেছেন, “ফোর্ডোর বিরুদ্ধে আমাদের একাধিক কৌশল রয়েছে, যা শুধু আকাশ থেকে বোমা ফেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।” তবে, এই ধরনের অভিযান অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং আন্তর্জাতিক পরিণতি বয়ে আনতে পারে।






































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































