arrest-গ্রেপ্তার-newsedge24

মালয়েশিয়ার পুলিশ জঙ্গিবাদবিরোধী একটি সমন্বিত অভিযানে ইসলামিক স্টেট (আইএস) মতাদর্শসম্পন্ন একটি বিদেশি জঙ্গিচক্র ভেঙে দিয়েছে। এই চক্রের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে ৩৬ জন বাংলাদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাতুক সেরি সাইফুদ্দিন নাসিউশন ইসমাইল ২৭ জুন ২০২৫-এ এক বিবৃতিতে এ তথ্য নিশ্চিত করেন। অভিযানটি ২৪ এপ্রিল থেকে জুন ২০২৫ পর্যন্ত সেলাঙ্গর এবং জোহর রাজ্যে তিন ধাপে পরিচালিত হয়।

অভিযানের বিবরণ

মালয়েশিয়ার গোয়েন্দা শাখার নেতৃত্বে পরিচালিত এই অভিযানে গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিম্নলিখিত অভিযোগ উঠেছে:

  • চরমপন্থী মতাদর্শ প্রচার: গ্রেপ্তারকৃতরা ইসলামিক স্টেটের মতাদর্শ অনুসরণ করে এবং তা মালয়েশিয়ায় আমদানি ও প্রচারে জড়িত ছিল।
  • নিয়োগ কার্যক্রম: তারা মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে নিয়োগকেন্দ্র গড়ে তুলেছিল এবং নতুন সদস্য সংগ্রহের চেষ্টা করছিল।
  • অর্থ সংগ্রহ: সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য অর্থ সংগ্রহ এবং সম্পদ সংগ্রহের পরিকল্পনা ছিল তাদের।
  • সরকার উৎখাতের পরিকল্পনা: বাংলাদেশে বৈধ সরকার উৎখাতের লক্ষ্যে পরিকল্পনা করছিল বলে গোয়েন্দা তথ্যে উঠে এসেছে।

গ্রেপ্তার ও আইনি ব্যবস্থা

  • মামলা ও বিচার: ৩৬ জনের মধ্যে পাঁচজনের বিরুদ্ধে মালয়েশিয়ার সন্ত্রাসবাদবিরোধী আইনের (POTA) আওতায় শাহ আলম এবং জোহর বাহরু সেশন্স কোর্টে মামলা চলছে।
  • দেশে ফেরত: ১৫ জনকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়েছে।
  • তদন্ত চলমান: বাকি ১৬ জনের বিষয়ে তদন্ত চলছে, এবং তাদের সম্পৃক্ততার গভীরতা যাচাই করা হচ্ছে।

মালয়েশিয়ার সরকারের অবস্থান

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাইফুদ্দিন নাসিউশন ইসমাইল জোর দিয়ে বলেন:

  • মালয়েশিয়া কখনোই বিদেশি চরমপন্থী গোষ্ঠীর জন্য আশ্রয়স্থল বা ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হবে না।
  • জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়ে সরকারের শূন্য সহনশীলতা নীতি রয়েছে।
  • পুলিশ ও গোয়েন্দা ইউনিটগুলোর পেশাদারিত্ব এই অভিযানের সাফল্য প্রমাণ করে।

মন্ত্রী আরও জানান, দেশের সার্বভৌমত্ব ও জননিরাপত্তা রক্ষায় গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করা হবে এবং দেশি-বিদেশি নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় আরও শক্তিশালী করা হবে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “মালয়েশিয়াকে জঙ্গি তৎপরতার ঘাঁটি বা ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহারের যেকোনো প্রচেষ্টা শক্ত হাতে দমন করা হবে।”

গ্রেপ্তারকৃত বাংলাদেশি নাগরিকদের ইসলামিক স্টেটের সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং বাংলাদেশে সরকার উৎখাতের পরিকল্পনা দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক। বাংলাদেশে অতীতে জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি), নও-জেএমবি এবং আনসারুল ইসলামের মতো জঙ্গি সংগঠনগুলো সক্রিয় ছিল। ২০১৬ সালের হলি আর্টিসান বেকারি হামলাসহ বিভিন্ন সময়ে আইএস-সংশ্লিষ্ট হামলার দায় স্বীকার করা হয়েছে, যদিও সরকার প্রায়শই আইএস-এর উপস্থিতি অস্বীকার করে।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। মালয়েশিয়ায় গ্রেপ্তার এই ব্যক্তিরা সম্ভবত এই অস্থিরতাকে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা করছিল।

মালয়েশিয়া দীর্ঘদিন ধরে আইএস এবং অন্যান্য জঙ্গি সংগঠনের (যেমন আবু সায়্যাফ, জেমা ইসলামিয়া) বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। ২০১৩ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে দেশটি শত শত ব্যক্তিকে জঙ্গি কার্যকলাপের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার করেছে। ২০১৬ সালে কুয়ালালামপুরে আইএস-সংশ্লিষ্ট একটি গ্রেনেড হামলা এবং ২০১৭ সালে ফিলিপাইনের মিন্দানাওভিত্তিক জঙ্গি সেলের সঙ্গে বাংলাদেশিদের জড়িত থাকার ঘটনা মালয়েশিয়ার নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সতর্কতা বাড়িয়েছে।

মালয়েশিয়ার এই জঙ্গিবাদবিরোধী অভিযান বাংলাদেশের জন্য একটি সতর্কবার্তা। গ্রেপ্তারকৃতদের পরিকল্পনা এবং আইএস মতাদর্শের প্রচার দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি। বাংলাদেশ সরকারের উচিত ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের তদন্তে মালয়েশিয়ার সঙ্গে সহযোগিতা করা এবং দেশের মধ্যে জঙ্গি নিয়োগ ও র‌্যাডিক্যালাইজেশন রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *