ডোনাল্ড ট্রাম্প-ইলন মাস্ক-newsedge24

বিশ্বের শীর্ষ ধনকুবের ইলন মাস্ক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত কর ও ব্যয় বিলকে “জঘন্য জিনিস” (disgusting abomination) বলে তীব্র সমালোচনা করেছেন। তাঁর এই আক্রমণাত্মক মন্তব্য ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের মধ্যে ক্রমবর্ধমান মনোমালিন্যের ইঙ্গিত দিচ্ছে। মাস্ক তাঁর মালিকানাধীন সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ একাধিক পোস্টে এই বিলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, যা গত মাসে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে এক ভোটের ব্যবধানে পাস হয়েছে।

“ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল অ্যাক্ট” নামে পরিচিত এই বিলে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রধান নীতিগত অগ্রাধিকারগুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০১৭ সালের করছাড় নীতির সম্প্রসারণ, যা মূলত ধনীদের জন্য বেশি সুবিধা নিয়ে আসবে। প্রতিরক্ষা ও অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে অর্থ বরাদ্দ বৃদ্ধি, যার মধ্যে মেক্সিকো সীমান্তে বাধা নির্মাণের জন্য ৪৬৫০ কোটি ডলার অন্তর্ভুক্ত। জাতীয় ঋণসীমা ৪ ট্রিলিয়ন ডলার বাড়ানো, যা সরকারকে আরও ঋণ নেওয়ার সুযোগ দেবে। মেডিকেড ও সাপ্লিমেন্টাল নিউট্রিশন অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রাম (SNAP) এর মতো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে কাটছাঁট।

ইলন মাস্ক, যিনি ট্রাম্পের ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় ২৫০ মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থায়ন করেছিলেন এবং সরকারি দক্ষতা বিভাগ (DOGE)-এর প্রধান হিসেবে ১২৯ দিন কাজ করেছেন, এই বিলকে “বিশাল, অতিরঞ্জিত ও অপ্রয়োজনীয় খরচে ভরা” বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি এক্স-এ লিখেছেন “এই বিল বিশাল বাজেট ঘাটতিকে ২.৫ ট্রিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাবে এবং মার্কিন নাগরিকদের ওপর অসহনীয় ঋণের বোঝা চাপাবে। তাঁরা জানেন তাঁরা ভুল করেছেন। এই অতিরিক্ত খরচ আমেরিকাকে ঋণের দাসত্বের দিকে নিয়ে যাবে। যাঁরা এই বিলের পক্ষে ভোট দিয়েছেন, তাঁদের ধিক্কার জানাই। আগামী নভেম্বরে আমরা আমেরিকার মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতাকারী সব রাজনীতিকদের সরিয়ে দেব।” মাস্ক আরও বলেন, সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধ এখনই সরকারি রাজস্বের ২৫% গ্রাস করছে, এবং এই ধরনের ঘাটতি অব্যাহত থাকলে সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা বা প্রতিরক্ষার জন্য কোনো অর্থ থাকবে না।

হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট মাস্কের সমালোচনাকে উড়িয়ে দিয়ে বলেন, “প্রেসিডেন্ট ইতিমধ্যেই জানেন ইলন মাস্ক এই বিলের বিষয়ে কী অবস্থানে আছেন। এটি প্রেসিডেন্টের মতামত পরিবর্তন করবে না। এটি একটি বড়, দারুণ বিল, এবং তিনি এটির প্রতি অটল।”

হাউস স্পিকার মাইক জনসন মাস্কের মন্তব্যকে “খুবই হতাশাজনক” বলে উল্লেখ করে বলেন, তিনি মাস্কের সঙ্গে ২০ মিনিট ফোনে কথা বলেছিলেন এবং মনে করেছিলেন যে তারা একমত হয়েছেন। তিনি বলেন, “আমার বন্ধু ইলন এই বিল নিয়ে ভুল করেছেন।”

মাস্কের সমালোচনা রিপাবলিকান পার্টির মধ্যে বিদ্যমান মতবিরোধকে আরও উসকে দিয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদে বিলটি পাসের সময় দুজন রিপাবলিকান সদস্য, যেমন কেনটাকির টমাস ম্যাসি, এর বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিলেন। ম্যাসি মাস্কের পোস্টের সমর্থনে বলেন, “তিনি ঠিক বলেছেন।” সিনেটে বিলটি নিয়ে আলোচনা চলছে, এবং রিপাবলিকান সিনেটর র‍্যান্ড পল ও মাইক লি-এর মতো ফিসকাল কনজারভেটিভরা মাস্কের সঙ্গে একমত হয়ে বিলটিতে আরও কাটছাঁটের দাবি জানাচ্ছেন। র‍্যান্ড পল বলেন, “আমি ইলনের সঙ্গে একমত। আমরা সরকারি খরচের বিশাল অপচয় দেখেছি, এবং আরও ৫ ট্রিলিয়ন ডলার ঋণ একটি বিরাট ভুল।” সিনেটর রন জনসনও বিলটিতে গভীর কাটছাঁটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

আশ্চর্যজনকভাবে, মাস্কের সমালোচনা ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে সমর্থন পেয়েছে। সিনেটের সংখ্যালঘু নেতা চাক শুমার বলেন, “আমি কখনো ভাবিনি এটা সম্ভব, কিন্তু আমি ইলন মাস্কের সঙ্গে একমত।” তিনি বিলটিকে “ধনীদের জন্য করছাড়ের বিনিময়ে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা কেড়ে নেওয়ার” একটি নিষ্ঠুর প্রচেষ্টা বলে সমালোচনা করেন। সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সও বলেন, “মাস্ক ঠিক বলেছেন, এই বিল একটি জঘন্য জিনিস।”

ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা মাস্ক ফেব্রুয়ারি থেকে মে ৩০, ২০২৫ পর্যন্ত DOGE-এর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ২ ট্রিলিয়ন ডলার খরচ কাটার লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু করলেও, DOGE ওয়েবসাইটের দাবি অনুযায়ী ১৭৫ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করা হয়েছে, যদিও এই দাবির পক্ষে পূর্ণাঙ্গ প্রমাণ নেই। তাঁর নেতৃত্বে ১১টি ফেডারেল এজেন্সি বন্ধ বা কাটছাঁট করা হয় এবং ২৫০,০০০ ফেডারেল কর্মী চাকরি হারান, যা ব্যাপক সমালোচনা ও মামলার কারণ হয়েছে। মাস্কের সমালোচনার একটি সম্ভাব্য কারণ হলো বিলে বৈদ্যুতিক যানবাহন (EV) এবং পরিচ্ছন্ন শক্তি করছাড় বাতিলের প্রস্তাব, যা তাঁর কোম্পানি টেসলার ব্যবসায়ের জন্য ক্ষতিকর। টেসলার শেয়ার মূল্য এ বছর ১৩% কমেছে, এবং প্রথম ত্রৈমাসিকে মুনাফা ৭১% কমে ৪০৯ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

বিলটি এখন রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত সিনেটে আলোচনাধীন। এটি পাস করতে মাত্র তিনটি ভোট হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। ফিসকাল কনজারভেটিভদের বিরোধিতা এবং মাস্কের প্রকাশ্য সমালোচনার কারণে বিলটি সংশোধন বা বাতিলের মুখে পড়তে পারে। সিনেটে বিলটি পাস না হলে সরকারি তহবিল সংকটের আশঙ্কা রয়েছে, যা ফেডারেল সরকারের কার্যক্রমকে ব্যাহত করতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *