প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিহার ও পশ্চিমবঙ্গ সফরে গিয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের ইস্যুতে তীব্র বক্তব্য রেখেছেন। তিনি এই ইস্যুকে জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হিসেবে উল্লেখ করে তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) এবং কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ভোটব্যাঙ্ক রাজনীতির জন্য অনুপ্রবেশকারীদের প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। বিহারের গয়ায় এবং পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় জনসভায় তার এই বক্তব্য উত্থাপিত হয়, যা আসন্ন বিহার ও পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে এই ইস্যুর গুরুত্ব তুলে ধরে।
বিহারে মোদির বক্তব্য
গয়ার জনসভায় মোদি বলেন, “দেশে অবৈধ অভিবাসীদের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা উদ্বেগের বিষয়। বিশেষ করে বিহারের সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে জনসংখ্যার বিন্যাস দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এনডিএ সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে অবৈধ অভিবাসীরা আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না। আমরা তাদের বিহারের জনগণের জন্য নির্ধারিত চাকরি কেড়ে নিতে দেব না।” তিনি ‘হাই-পাওয়ার ডেমোগ্রাফি মিশন’ নামে একটি উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন, যা শীঘ্রই শুরু হবে এবং “প্রত্যেক অবৈধ অভিবাসীকে বহিষ্কার করবে।”
মোদি কংগ্রেস এবং রাষ্ট্রীয় জনতা দল (আরজেডি)-কে তীব্রভাবে সমালোচনা করে বলেন, “যারা এই অনুপ্রবেশকারীদের সমর্থন করছে, তাদের চিনে রাখুন। তারা ভোটব্যাঙ্কের জন্য বিহারের মানুষের অধিকার কেড়ে নিয়ে অনুপ্রবেশকারীদের দিতে চায়।” তিনি এই ইস্যুকে স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে উল্লেখ করা ‘জনসংখ্যা সংকট’-এর সঙ্গে যুক্ত করে বলেন, এটি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি।
পশ্চিমবঙ্গে মোদির বক্তব্য
কলকাতায় জনসভায় মোদি তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের উপর তীব্র আক্রমণ চালান। তিনি বলেন, “ভারতের সম্পদ সীমিত। আমাদের যুব সমাজের জন্য উপার্জনের সুযোগ এবং নাগরিকদের জন্য সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু অনুপ্রবেশকারীরা চাকরি কেড়ে নিচ্ছে, নাগরিকদের অধিকারে ভাগ বসাচ্ছে, এমনকি মা-বোনেদের সম্মানে হাত দিচ্ছে। তৃণমূল কংগ্রেস ভোটব্যাঙ্কের জন্য তাদের প্রশ্রয় দিচ্ছে।” তিনি অভিযোগ করেন যে টিএমসি সরকার কৃষক ও আদিবাসীদের জমি দখলের ক্ষেত্রে জড়িত এবং জনকল্যাণের জন্য কেন্দ্রীয় তহবিল লুট করছে।
মোদি বলেন, “পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস, বামেরা এবং এখন তৃণমূলের শাসন দেখেছে। ১৫ বছর আগে আপনারা ‘মা-মাটি-মানুষ’ স্লোগানে পরিবর্তন চেয়েছিলেন, কিন্তু পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। তৃণমূলের শাসনে ‘ক্রাইম’ এবং ‘করাপশন’ বাংলার পরিচয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তৃণমূল গেলে তবেই আসল পরিবর্তন আসবে।” তিনি কেন্দ্রীয় তহবিলের অপব্যবহারের অভিযোগ তুলে বলেন, “আমরা পশ্চিমবঙ্গের জন্য যে অর্থ পাঠাই, তার বেশিরভাগ টিএমসি ক্যাডারদের পকেটে যায়, জনগণের জন্য খরচ হয় না।”
আরও পড়ুন: ভারতে মোদি সমর্থকদের মার্কিন পণ্য বর্জনের ডাক
তিনি পশ্চিমবঙ্গে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন, “লালকেল্লা থেকে আমি বলেছি, যারা নকল কাগজপত্র নিয়ে এখানে রয়েছে, তাদের যেতে হবে। ভারতের সংবিধান অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
বিহারে মোদি প্রায় ১৩,০০০ কোটি রুপির উন্নয়ন প্রকল্প উদ্বোধন ও শিলান্যাস করেন, যার মধ্যে রয়েছে আমৃত ভারত এক্সপ্রেস ও বৌদ্ধ সার্কিট ট্রেনের উদ্বোধন এবং আউন্তা-সিমারিয়া গঙ্গা সেতুর উদ্বোধন। তিনি ১৬,০০০ পাকা বাড়ি মাগধ অঞ্চলে হস্তান্তর করেন এবং বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমারের স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রশংসা করেন।
কলকাতায় তিনি মেট্রো রেলের তিনটি রুট এবং ৫,২০০ কোটি রুপিরও বেশি মূল্যের বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প উদ্বোধন ও শিলান্যাস করেন। তিনি বলেন, এই প্রকল্পগুলো পশ্চিমবঙ্গের শিল্প, পর্যটন ও সংযোগ বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
মোদির বক্তব্যে বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন নির্বাচনে অবৈধ অনুপ্রবেশ ইস্যু প্রধান রাজনৈতিক বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে। তিনি বিরোধী দলগুলোর সমালোচনা করে বলেন, কংগ্রেস ও আরজেডি বিহারে এবং টিএমসি পশ্চিমবঙ্গে ভোটব্যাঙ্ক রাজনীতির জন্য অনুপ্রবেশকারীদের সমর্থন করছে। তিনি বিহারে সংবিধান (১৩০তম সংশোধনী) বিলের বিরোধিতার জন্য বিরোধীদের সমালোচনা করেন, যা গুরুতর অভিযোগে ৩০ দিনের বেশি আটক থাকা প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী বা মন্ত্রীদের পদত্যাগ বাধ্যতামূলক করে।
আরও পড়ুন: প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে মোদিকে শারদ পাওয়ারের সতর্কবার্তা
পশ্চিমবঙ্গে মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন টিএমসি সরকারের বিরুদ্ধে মোদি অভিযোগ করেন যে তারা কেন্দ্রীয় তহবিলের অপব্যবহার করছে এবং উন্নয়নের পথে বাধা সৃষ্টি করছে। তিনি পশ্চিমবঙ্গে টিএমসি সরকারের বিরুদ্ধে জনরোষের কথা উল্লেখ করে বলেন, “তৃণমূলের শাসন চললে বাংলার উন্নয়ন থমকে থাকবে।”
পর্যবেক্ষকদের মতে, মোদির বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে অবৈধ অনুপ্রবেশ বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে প্রধান ইস্যু হতে যাচ্ছে। এই ইস্যুতে তিনি বিরোধীদের কোণঠাসা করার চেষ্টা করছেন, বিশেষ করে টিএমসি ও কংগ্রেস-আরজেডি জোটকে।
বিরোধী নেতারা যেমন রাহুল গান্ধী এবং তেজস্বী যাদব এই ইস্যুতে নির্বাচন কমিশনের বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে সমালোচনা করেছেন। তারা দাবি করেছেন, এটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা।






































































































































































































































































































































































































































































































































































































































