ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম এক বছর পার হতেই মার্কিন অভিবাসন ব্যবস্থায় এক আমূল পরিবর্তনের চিত্র ফুটে উঠেছে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষায় একের পর এক নির্বাহী আদেশ ও নীতিগত কড়াকড়িতে শুধু অবৈধ অনুপ্রবেশ নয়, বরং বৈধ পথে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী হওয়া বা কাজ করতে আসাও এখন পাহাড়সম কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য ছিল ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির পূর্ণ বাস্তবায়ন। এর অংশ হিসেবে হোয়াইট হাউস অভিবাসন ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে শুরু করে। গত ১২ মাসে এমন কিছু প্রশাসনিক সংস্কার আনা হয়েছে, যা কয়েক দশকের প্রচলিত নিয়মকে কার্যত অচল করে দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তনের গতি ও প্রকৃতি এতটাই তীব্র যে, একে অনেকে ‘অভিবাসন ব্যবস্থার নতুন লৌহ পর্দা’ হিসেবে অভিহিত করছেন।

সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে পারিবারিক স্পনসরশিপ ও কর্মসংস্থানভিত্তিক ভিসার ওপর। আগে যেখানে নথিপত্র ঠিক থাকলে বৈধ অভিবাসন ছিল একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া, এখন সেখানে সামান্য ত্রুটি বা অস্পষ্টতার কারণে আবেদন সরাসরি বাতিল করে দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া এইচ-১বি (H-1B) ভিসার মতো জনপ্রিয় ক্যাটাগরিগুলোতেও যাচাই-বাছাইয়ের মাত্রা কয়েক গুণ বাড়ানো হয়েছে।

অনেকেই মনে করেছিলেন ট্রাম্পের মূল আঘাত আসবে কেবল অবৈধ অভিবাসনের ওপর। কিন্তু বাস্তবের চিত্র ভিন্ন। আইনি প্রক্রিয়ায় যারা গ্রিন কার্ড বা নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করছেন, তাদের ক্ষেত্রেও ‘পাবলিক চার্জ’ বা সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতার অজুহাতে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। অর্থাৎ, অভিবাসন প্রত্যাশীদের আর্থিক স্বচ্ছলতা প্রমাণের মানদণ্ড এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন।

অভিবাসন বিশ্লেষক ড. জোনাথন রিড বলেন, “বর্তমান প্রশাসন এমন একটি পরিবেশ তৈরি করছে যেখানে অভিবাসীদের সম্পদ ও দক্ষতাকে অতি-উচ্চ মানদণ্ডে মাপা হচ্ছে। এটি কেবল নিরাপত্তা নয়, বরং মার্কিন জনতাত্ত্বিক কাঠামো বদলে দেওয়ার একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রচেষ্টার অংশ।”

পরিবর্তিত নীতির প্রধান দিকগুলো:

  • কঠোর স্ক্রিনিং: বৈধ ভিসার ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক রেকর্ড পরীক্ষা করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
  • পারিবারিক ভিসায় কোটা: ফ্যামিলি রিইউনিয়ন বা পারিবারিক বন্ধনের ভিত্তিতে আসা অভিবাসীদের সংখ্যা হ্রাসে বিশেষ প্রশাসনিক ব্যবস্থা।
  • সীমান্ত কড়াকড়ি: মেক্সিকো সীমান্তে টহল জোরদারের পাশাপাশি রাজনৈতিক আশ্রয়ের (Asylum) আবেদনের সুযোগ সীমিত করা।
  • ভিসা ফি বৃদ্ধি: বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে আবেদন ফি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে, যা সাধারণ নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত অভিবাসীদের জন্য বড় বাধা।
  • দ্রুত বহিষ্কার: আইনি জটিলতা কাটিয়ে ওঠার সুযোগ না দিয়েই নথিপত্রহীনদের দ্রুত নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু।

ট্রাম্পের এই কঠোর নীতির ফলে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত দক্ষিণ এশীয়, বিশেষ করে বাংলাদেশী কমিউনিটির মধ্যে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বৈধভাবে স্বজনদের যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়ার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ায় অনেক পরিবার অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা বা উচ্চশিক্ষার জন্য যারা দেশটিতে যেতে চান, তাদের ক্ষেত্রেও সাক্ষাৎকারের হার ও রিজেকশন রেট বেড়েছে।

ব্যবসায়িক মহলেও এর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দিচ্ছে। সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো মনে করছে, দক্ষ জনশক্তির জন্য বৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়া সহজ থাকা প্রয়োজন। কিন্তু প্রশাসনিক কড়াকড়িতে মেধার প্রবাহ অন্য দেশে ডাইভার্ট হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *