ইরান-যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক আলোচনা-newsedge24

পারমাণবিক ইস্যুতে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র পঞ্চম দফার আলোচনার জন্য ইতালির রোমে বৈঠকে বসেছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফ এই আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন। ওমান এবারও মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে ভূমিকা পালন করছে। আলোচনার মূল লক্ষ্য হলো ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার বিষয়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো। তবে তেহরান ও ওয়াশিংটন এখনো কোনো উল্লেখযোগ্য ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি, এবং সাম্প্রতিক সময়ে উভয় পক্ষ তীব্র বাক্য বিনিময়ে জড়িয়েছে। বিশেষ করে, ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষোভ স্পষ্ট। এ খবর প্রকাশ করেছে আল জাজিরা।

মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “ইরানকে কখনোই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে দেওয়া হবে না।” ইরান এখন পর্যন্ত ৬০ শতাংশ বিশুদ্ধতার ইউরেনিয়াম মজুদ করেছে, যা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ৯০ শতাংশ বিশুদ্ধতার কাছাকাছি। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA) জানিয়েছে, ইরানের কাছে এমন পরিমাণ উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে, যা ৯০ শতাংশে সমৃদ্ধ করা হলে তাতে ছয়টি পারমাণবিক বোমা তৈরি সম্ভব। এই পরিসংখ্যান যুক্তরাষ্ট্রকে উদ্বিগ্ন করেছে। তবে ইরান বারবার দাবি করেছে, তারা শুধুমাত্র বেসামরিক উদ্দেশ্যে (যেমন বিদ্যুৎ উৎপাদন ও চিকিৎসা গবেষণা) ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করছে এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই।

ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি মার্কিন এই দাবিকে “অতিরঞ্জিত এবং আপত্তিকর” বলে সমালোচনা করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, চলমান আলোচনা থেকে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাওয়ার সম্ভাবনা কম। গত মঙ্গলবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি চুক্তি চায়, যেখানে ইরানকে বেসামরিক উদ্দেশ্যে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হলেও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না। তবে তিনি স্বীকার করেছেন, এই বিষয়ে ইরানের সঙ্গে ঐকমত্যে পৌঁছানো “সহজ নয়”।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জোর দিয়ে বলেছেন, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ তাদের “অবিচ্ছেদ্য অধিকার” এবং এ বিষয়ে কোনো আপস করা হবে না। তিনি উল্লেখ করেছেন, ১৯৬৮ সালের পারমাণবিক অপ্রসারণ চুক্তির (NPT) স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে ইরানের বেসামরিক উদ্দেশ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার রয়েছে। তবে তিনি এটাও বলেছেন, আস্থা তৈরির জন্য সমৃদ্ধকরণের মাত্রা, পরিমাণ বা সময়কাল নিয়ে আলোচনা সম্ভব। এছাড়া, ইরানের শীর্ষ উপদেষ্টা আলী শামখানি জানিয়েছেন, নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিনিময়ে ইরান উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ পরিত্যাগ করতে, কম বিশুদ্ধতার সমৃদ্ধকরণে ফিরে যেতে এবং আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের তদারকির অনুমতি দিতে প্রস্তুত।

যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর ক্রমাগত চাপ বাড়িয়ে চলেছে। গত বৃহস্পতিবার তেহরানের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে দেশটি, যা ইরানের তেল রপ্তানি এবং ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের সমর্থনের সঙ্গে সম্পর্কিত। মার্কিন প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের পেছনে ইরানের দুর্বল অর্থনৈতিক অবস্থা এবং আঞ্চলিক প্রভাব কমে যাওয়াকে কাজে লাগানোর উদ্দেশ্য রয়েছে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই দুর্বলতার কারণেই ইরান সম্পূর্ণভাবে সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করতে রাজি হবে না, কারণ এটি তাদের জাতীয় গর্ব এবং নিরাপত্তার একটি প্রধান স্তম্ভ।

ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে উভয় পক্ষের “লাল রেখা” এই আলোচনাকে জটিল করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরানকে শূন্য সমৃদ্ধকরণ নীতি মেনে নিতে হবে, অর্থাৎ তাদের নিজস্ব সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম বন্ধ করে বেসামরিক উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় ইউরেনিয়াম আমদানি করতে হবে। অন্যদিকে, ইরান জোর দিয়ে বলছে, তারা তাদের সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা বা সেন্ট্রিফিউজ ধ্বংস করবে না এবং ২০১৫ সালের চুক্তিতে (JCPOA) সম্মত মজুদের নিচে ইউরেনিয়াম কমাবে না।

এছাড়া, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর প্রভাবও আলোচনায় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তিনি ইরানের সম্পূর্ণ পারমাণবিক অবকাঠামো ধ্বংসের দাবি জানিয়েছেন, যা ইরানের কাছে অগ্রহণযোগ্য। ইরানের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, নেতানিয়াহু ওয়াশিংটনে পিছনের দরজা দিয়ে লবিং করে এই আলোচনা ভণ্ডুল করার চেষ্টা করছেন।

২০১৫ সালের জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (JCPOA) চুক্তি ইরানকে ৩.৬৭ শতাংশ বিশুদ্ধতায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অনুমতি দিয়েছিল, যা বেসামরিক উদ্দেশ্যে যথেষ্ট। কিন্তু ২০১৮ সালে ট্রাম্পের প্রশাসন এই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর ইরান ধীরে ধীরে চুক্তির সীমা লঙ্ঘন করে এবং ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধকরণ শুরু করে। এই পটভূমিতে, ইউরোপীয় দেশগুলো (যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি) চুক্তির “স্ন্যাপব্যাক” ব্যবস্থার মাধ্যমে ইরানের ওপর জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের হুমকি দিয়েছে, যা অক্টোবর ২০২৫-এ মেয়াদ শেষ হবে। ইরান সতর্ক করেছে, এই ধরনের পদক্ষেপের ফলে তারা NPT থেকে বেরিয়ে যেতে এবং IAEA পরিদর্শকদের বহিষ্কার করতে পারে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইরানের অর্থনৈতিক সংকট এবং আঞ্চলিক প্রভাব কমে যাওয়ার কারণে তেহরান একটি চুক্তির জন্য আগ্রহী। তবে সম্পূর্ণ সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করা তাদের জন্য রাজনৈতিক ও জাতীয় মর্যাদার প্রশ্ন। অন্যদিকে, ট্রাম্পের হুমকি এবং ইসরায়েলের সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। যদি এই আলোচনা ব্যর্থ হয়, তবে সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি বাড়বে, যা মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *