ট্রাম্পের ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন-newsedge4

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসমের আপত্তি উপেক্ষা করে লস অ্যাঞ্জেলেসে অভিবাসনবিরোধী বিক্ষোভ দমনে ২,০০০ ন্যাশনাল গার্ড সদস্য মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছেন। এই পদক্ষেপ, যা ‘টাইটেল টেন অব দ্য ইউনাইটেড স্টেটস কোড’-এর আওতায় স্বাক্ষরিত এক আদেশের মাধ্যমে কার্যকর হয়েছে, ১৯৯২ সালের রোডনি কিং দাঙ্গার পর প্রথমবারের মতো কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট কর্তৃক ন্যাশনাল গার্ডের ফেডারেল নিয়ন্ত্রণে আনার ঘটনা। এই সিদ্ধান্ত ক্যালিফোর্নিয়ার রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে, যা অঙ্গরাজ্যের সার্বভৌমত্ব এবং দীর্ঘদিনের রীতিনীতির উপর চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

গত শুক্রবার (৬ জুন) থেকে লস অ্যাঞ্জেলেস ও তার আশপাশের এলাকায়, বিশেষ করে শহরের ফ্যাশন ডিস্ট্রিক্ট এবং প্যারামাউন্টে, ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসনবিরোধী অভিযানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। কেন্দ্রীয় অভিবাসন ও কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) কর্মকর্তারা শুক্রবার শহরের বিভিন্ন কর্মস্থলে অভিযান চালিয়ে কমপক্ষে ৪৪ জনকে গ্রেপ্তার করে, যাদের মধ্যে অনেকে নথিবিহীন অভিবাসী। এই অভিযান ট্রাম্পের ঘোষিত ‘ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দেশত্যাগ কর্মসূচি’-র অংশ, যার লক্ষ্য প্রতিদিন ৩,০০০ অভিবাসী গ্রেপ্তার করা।

বিক্ষোভকারীরা মেক্সিকান পতাকা নাড়িয়ে এবং “আইসিইকে লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে বের করো” স্লোগান দিয়ে রাস্তায় নেমে আসে। প্যারামাউন্টে একটি হোম ডিপোর কাছে বিক্ষোভ তীব্র হয়ে ওঠে, যেখানে বিক্ষোভকারীরা পাথর, বোতল এবং ফায়ারওয়ার্ক ছুড়লে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী টিয়ার গ্যাস, ফ্ল্যাশ ব্যাং গ্রেনেড এবং রাবার বুলেট ব্যবহার করে। শনিবারের বিক্ষোভে কমপক্ষে ২০ জন গ্রেপ্তার হন, এবং রোববার আরও ১০ জনকে আটক করা হয়। এসইআইউ ক্যালিফোর্নিয়ার প্রেসিডেন্ট ডেভিড হুয়ের্তাসহ বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারী আহত হন এবং গ্রেপ্তার হন।

ট্রাম্প শনিবার একটি প্রেসিডেন্সিয়াল মেমোরেন্ডামে স্বাক্ষর করে ২,০০০ ন্যাশনাল গার্ড সদস্যকে লস অ্যাঞ্জেলেসে মোতায়েনের নির্দেশ দেন, যা তিনি “শহরের আইনশৃঙ্খলাহীনতা” মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় বলে বর্ণনা করেন। এই গার্ড সদস্যরা ফেডারেল সম্পত্তি ও কর্মীদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য নিয়োজিত, এবং তারা সরাসরি প্রেসিডেন্টের নির্দেশে কাজ করছে, গভর্নর নিউসমের নয়। ট্রাম্প তার সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, “গভর্নর গ্যাভিন নিউসম এবং মেয়র কারেন বাস যদি তাদের কাজ করতে না পারেন, তবে ফেডারেল সরকার দাঙ্গা ও লুটপাটের সমস্যা সমাধান করবে!”

রোববার সকালে প্রায় ৩০০ গার্ড সদস্য লস অ্যাঞ্জেলেসে পৌঁছায়, যারা ৭৯তম ইনফ্যান্ট্রি ব্রিগেড কমব্যাট টিমের সদস্য। তারা ফেডারেল ভবন এবং আইসিই কর্মীদের সুরক্ষায় মোতায়েন হয়। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, সহিংসতা অব্যাহত থাকলে ক্যাম্প পেন্ডলটন থেকে সক্রিয় ডিউটি মেরিন সৈন্য মোতায়েন করা হবে। সোমবার পর্যন্ত ৭০০ মেরিন সৈন্য লস অ্যাঞ্জেলেসে পৌঁছানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে।

গভর্নর নিউসম এই মোতায়েনকে “অবৈধ এবং অনৈতিক” এবং “উদ্দেশ্যমূলকভাবে উস্কানিমূলক” বলে নিন্দা করেছেন। তিনি এক্স-এ লিখেছেন, “ট্রাম্প কোনো আইনশৃঙ্খলার ঘাটতির কারণে নয়, বরং একটি দৃশ্য তৈরির জন্য ২,০০০ সৈন্য মোতায়েন করছেন। শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করুন, সহিংসতায় জড়াবেন না।” নিউসম ঘোষণা করেছেন যে ক্যালিফোর্নিয়া সোমবার ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করবে, যুক্তি দেখিয়ে যে এই মোতায়েন রাজ্যের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করেছে।

লস অ্যাঞ্জেলেসের মেয়র কারেন বাস এই অভিযানকে “সন্ত্রাস ছড়ানোর কৌশল” বলে সমালোচনা করেছেন এবং বিক্ষোভকারীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “শহরের কয়েকটি রাস্তায় পরিস্থিতি খারাপ দেখালেও, এটি শহরব্যাপী অস্থিরতা নয়।” এছাড়া, ক্যালিফোর্নিয়ার লেফটেন্যান্ট গভর্নর এলেনি কাউনালাকিস এই পদক্ষেপকে হাঙ্গেরির শাসক ভিক্টর অরবানের কৌশলের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

সিএনএনের জাতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক জুলিয়েট কায়েম ট্রাম্প প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে “অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া” বলে অভিহিত করেছেন। তিনি এক্স-এ লিখেছেন, “শহরের বিক্ষোভ সামাল দেওয়ার দায়িত্ব পুলিশ ও রাজ্য কর্তৃপক্ষের। গভর্নরের ইচ্ছার বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্টের হস্তক্ষেপ আধুনিককালে নজিরবিহীন।” কায়েম আরও বলেন, “ফেডারেল নিয়ন্ত্রণে থাকা সৈন্যরা রাজনৈতিক সংকট শান্তভাবে মোকাবিলার জন্য প্রশিক্ষিত নয়, যা সহিংসতার ঝুঁকি বাড়ায়।”

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের নির্বাহী পরিচালক পল ও’ব্রায়েন এই মোতায়েনকে “বিপজ্জনক” বলে সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, “এটি মানবাধিকারের পক্ষে কথা বলা মানুষদের দমন এবং ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে করা হয়েছে, জনগণের সুরক্ষার জন্য নয়।” অ্যামেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন (এসিএলইউ) এটিকে “ক্যালিফোর্নিয়ার জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা” বলে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ ১৯৬৫ সালের পর প্রথম, যখন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন জনসন গভর্নরের অনুরোধ ছাড়াই আলাবামায় ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করেছিলেন সিভিল রাইটস প্রতিবাদীদের সুরক্ষা দিতে। ১৯৯২ সালে রোডনি কিং দাঙ্গায় ক্যালিফোর্নিয়ার তৎকালীন গভর্নর পিট উইলসনের অনুরোধে প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ. ডব্লিউ. বুশ ১০,০০০ গার্ড সদস্য মোতায়েন করেছিলেন। তবে, বর্তমান ঘটনায় নিউসম বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষ কোনো সহায়তা চাননি, যা এই মোতায়েনকে বিতর্কিত করে তুলেছে।

১৯৫৭ সালে প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট আইজেনহাওয়ার লিটল রক, আরকানসাসে ন্যাশনাল গার্ডকে ফেডারেল নিয়ন্ত্রণে এনেছিলেন, যখন গভর্নর বর্ণবৈষম্য বিরোধী আদালতের আদেশ মানতে অস্বীকার করেছিলেন। ট্রাম্পের ক্ষেত্রে এমন কোনো আদালতের আদেশ লঙ্ঘনের প্রমাণ নেই, যা এই পদক্ষেপের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

ট্রাম্প ও নিউসমের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিবাদ এই ঘটনায় নতুন মাত্রা পেয়েছে। ট্রাম্প বারবার ক্যালিফোর্নিয়ার ফেডারেল তহবিল বন্ধের হুমকি দিয়েছেন, সম্প্রতি বন্যা প্রতিরোধ প্রকল্পের ১২৬.৪ মিলিয়ন ডলারের তহবিল কাটছাঁট করেছেন। সিএনএনের বিশ্লেষক অ্যাসটেড হার্নডন মনে করেন, “হোয়াইট হাউস ইচ্ছাকৃতভাবে উত্তেজনা বাড়াচ্ছে, যাতে নিউসমের সঙ্গে লড়াইয়ের মাধ্যমে ফেডারেল ক্ষমতার প্রদর্শন করে রাজনৈতিক সুবিধা নিতে পারে।”

ট্রাম্পের সীমান্তবিষয়ক উপদেষ্টা টম হোমান এমনকি নিউসমের বিরুদ্ধে ফেডারেল অভিবাসন আইন বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগে গ্রেপ্তারের হুমকি দিয়েছেন, যা নিউসম “স্বৈরাচারের দিকে একটি স্পষ্ট পদক্ষেপ” বলে নিন্দা করেছেন।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই মোতায়েন সহিংসতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে, কারণ ন্যাশনাল গার্ড সদস্যরা বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে বিশেষজ্ঞ নন। জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্টিভ ভ্লাডেক বলেন, “ন্যাশনাল গার্ড সদস্যরা আইসিই কর্মকর্তারা যা করতে পারে, তার বাইরে কিছু করার আইনি ক্ষমতা রাখে না, যদি না ইনসারেকশন অ্যাক্ট প্রয়োগ করা হয়।” ট্রাম্প এখনও এই আইন প্রয়োগ করেননি, তবে ভবিষ্যতে এটি ব্যবহারের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি।

ক্যালিফোর্নিয়ার সিনেটর অ্যালেক্স পাডিলা ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে “তার নীতির সমালোচনা থেকে মনোযোগ সরানোর কৌশল” বলে সমালোচনা করেছেন। সোমবার আরও বিক্ষোভের পরিকল্পনা রয়েছে, এবং শহরের পরিস্থিতি এখনও উত্তপ্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *