ইসরায়েল ১৩ জুন ২০২৫ ভোররাতে ইরানে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে, যার কোডনাম ‘রাইজিং লায়ন’। এই হামলা তেহরানের ক্রমবর্ধমান পারমাণবিক কর্মসূচির বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ হিসেবে পরিচালিত হয়েছে, যা ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ওমানে নির্ধারিত পারমাণবিক আলোচনার ঠিক একদিন আগে ঘটে। হামলায় ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র কারখানা, এবং সামরিক নেতৃত্বের বাসস্থান লক্ষ্য করা হয়। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, এতে রেভল্যুশনারি গার্ডের প্রধান জেনারেল হোসেইন সালামি, সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল মোহাম্মদ বাঘেরি, কাথাম আল-আনবিয়া যৌথ বাহিনীর কমান্ডার মেজর জেনারেল গোলামআলী রশিদ, এবং পারমাণবিক বিজ্ঞানী ফারেদুন আব্বাসি ও মোহাম্মদ মেহদি তেহরানচিসহ ছয়জন বিজ্ঞানী নিহত হয়েছেন। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী (আইডিএফ) জানায়, ২০০টির বেশি যুদ্ধবিমান এবং ৩৩০টি মিউনিশন ব্যবহার করে ১০০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে।
ইরান পাল্টা জবাবে ১০০টির বেশি ড্রোন ইসরায়েলের দিকে পাঠিয়েছে, যার বেশিরভাগই ইসরায়েলি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দ্বারা আটকানো হয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এই হামলাকে “ইসরায়েলের নৃশংস অপরাধ” আখ্যা দিয়ে কঠোর প্রতিশোধের হুমকি দিয়েছেন। এই হামলার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে সর্বাত্মক যুদ্ধের আশঙ্কা তীব্র হয়েছে, যা তেলের দামে ৯% বৃদ্ধি ঘটিয়েছে, ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭৮ ডলারে পৌঁছেছে।
ইসরায়েল-ইরান শত্রুতার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:
ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের শত্রুতা ১৯৭৯ সালের ইরানি ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে তীব্র হয়। ইরানের নতুন শিয়াপন্থী শাসনব্যবস্হা ইসরায়েল-বিরোধী নীতি গ্রহণ করে। ১৯৮২ সালে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ গঠনের মাধ্যমে লেবাননে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ শুরু হয়। ১৯৮৩ সালে হিজবুল্লাহর আত্মঘাতী হামলা ইসরায়েলকে লেবানন থেকে পিছু হটতে বাধ্য করে। ১৯৯২-৯৪ সালে আর্জেন্টিনায় ইসরায়েলি দূতাবাস ও জুইশ সেন্টারে হামলার জন্য ইরান ও হিজবুল্লাহকে দায়ী করা হয়, যদিও তারা এই অভিযোগ অস্বীকার করে।
২০০২ সালে ইরানের গোপন পারমাণবিক কর্মসূচি প্রকাশ পাওয়ায় ইসরায়েল কঠোর পদক্ষেপের দাবি জানায়। ২০১০ সালে নাতাঞ্জে স্টাক্সনেট ভাইরাস ব্যবহার করে সাইবার হামলা চালানো হয়, যার পেছনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হাত ছিল বলে ধারণা করা হয়। ২০১২ সালে ইরানি পারমাণবিক বিজ্ঞানী মোস্তফা আহমাদি-রোশন হত্যাকাণ্ডে ইসরায়েলকে দায়ী করা হয়। ২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসন পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে আসে, এবং ইসরায়েল সিরিয়ায় ইরানি সামরিক অবকাঠামোতে হামলা চালায়। ২০২০ সালে কুদস ফোর্সের প্রধান কাসেম সোলাইমানি মার্কিন ড্রোন হামলায় নিহত হন, যাকে ইসরায়েল সমর্থন করে। ২০২১ সালে ইরানি পারমাণবিক বিজ্ঞানী মোহসেন ফখরিজাদেহের হত্যার জন্যও ইসরায়েলকে দায়ী করা হয়।
সাম্প্রতিক ঘটনাবলী:
২০২৪ সালে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা তীব্র হয়। এপ্রিলে দামেস্কে ইরানি দূতাবাসে ইসরায়েলি হামলায় সাতজন রেভল্যুশনারি গার্ড কর্মকর্তা নিহত হন। জবাবে ইরান ১৩ এপ্রিল ইসরায়েলে সরাসরি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। অক্টোবরে হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরুল্লাহ এবং হামাস প্রধান ইসমাইল হানিয়ার হত্যার পর ইরান ১৮০টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে, যার জবাবে ইসরায়েল ইরানের সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়।
জুন ২০২৫-এর হামলা পূর্ববর্তী সংঘাতের তুলনায় অনেক বেশি তীব্র। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেন, ইরান এক বছরেরও কম সময়ে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ক্ষমতা অর্জন করতে পারে, যা ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য হুমকি। তিনি এই হামলাকে “ইরানের পারমাণবিক হুমকি প্রতিরোধে অপরিহার্য” বলে বর্ণনা করেছেন। ইরান অবশ্য দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে যে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে।
মার্কিন ভূমিকা ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া:
যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তারা এই হামলায় সরাসরি জড়িত নয়, তবে ইসরায়েল তাদেরকে পূর্বে অবহিত করেছিল। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, এটি ইসরায়েলের আত্মরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ছিল। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে পারমাণবিক চুক্তিতে রাজি হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন, সতর্ক করে বলেছেন যে পরবর্তী হামলা আরও “নৃশংস” হবে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস উভয় পক্ষকে সংযমের আহ্বান জানিয়েছেন, বিশেষ করে পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। রাশিয়া এই হামলাকে “অগ্রহণযোগ্য” আখ্যা দিয়ে জাতিসংঘের চার্টার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে।
বিশ্লেষণ:
ইসরায়েলের এই হামলা ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা এবং সামরিক নেতৃত্বের ওপর উল্লেখযোগ্য আঘাত হানলেও, এটি মধ্যপ্রাচ্যে বৃহত্তর সংঘাতের ঝুঁকি বাড়িয়েছে। ইরানের প্রতিশোধমূলক ড্রোন হামলা এবং তাদের “কঠোর জবাব” দেওয়ার হুমকি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইরানের তথাকথিত “অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স” (হিজবুল্লাহ, হুথি, এবং ইরাক ও সিরিয়ার মিলিশিয়া গ্রুপ) ইসরায়েলের এই হামলার জবাবে সক্রিয় হতে পারে, যদিও গত এক বছরে এই নেটওয়ার্ক উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়েছে। এই হামলা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক আলোচনাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে, যা ইতিমধ্যেই স্থবির হয়ে পড়েছে।
ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের শত্রুতা এখন প্রকাশ্য সংঘাতে রূপ নিয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি। জুন ২০২৫-এর হামলা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ইসরায়েলি আক্রমণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তবে, ইরানের পাল্টা হামলার সম্ভাবনা এবং আঞ্চলিক প্রক্সি গ্রুপগুলোর সম্পৃক্ততা একটি সর্বাত্মক যুদ্ধের আশঙ্কাকে আরও তীব্র করছে।






























































































































































































































































































































































































































































































































































































































































