মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ: ১৪ দেশে ছড়িয়েছে সংঘাত, প্রাণহানি ছাড়াল ২৫০০

পারমাণবিক কর্মসূচি ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন বন্ধের লক্ষ্য নিয়ে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ভয়াবহ অগ্নিকুণ্ডে পরিণত করেছে। পাল্টাপাল্টি হামলায় এই সংঘাত এখন কেবল দুই পক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং অঞ্চলের ১৪টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত তিন সপ্তাহে এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২,৫৩০ জনে।

সংঘাতের সূত্রপাত ও বর্তমান পরিস্থিতি

বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘদিনের স্নায়ুযুদ্ধ এখন প্রকাশ্য রণাঙ্গনে রূপ নিয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী ইরানের সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনা লক্ষ্য করে বড় ধরনের বিমান হামলা শুরু করে। ওয়াশিংটনের দাবি, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখতে এই আক্রমণ ‘অপরিহার্য’ ছিল। তবে তেহরান এই হামলাকে তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করে তাৎক্ষণিক প্রতিশোধের ঘোষণা দেয়।

ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কেঁপে উঠছে ইসরায়েলের বিভিন্ন শহর। একইসঙ্গে তেহরান তাদের রণকৌশল পরিবর্তন করে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে থাকা মার্কিন ও ইসরায়েলি স্বার্থ সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোতেও আঘাত হানছে। ফলে ইরাক, সিরিয়া ও পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে যেখানে মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে, সেখানেও নিয়মিত বিরতিতে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছে।

মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে অঞ্চলটি

আল-জাজিরার তথ্যমতে, গত কয়েকদিনের সংঘাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইরান। দেশটিতে নিহতের সংখ্যা ১,৪৪৪ জন। এছাড়া লেবাননে হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলি বাহিনীর সংঘাতের জেরে প্রাণ হারিয়েছেন ৯৬৮ জন। ইরাকেও মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে চালানো হামলায় ৬০ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে, যুদ্ধের প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইনের মতো তুলনামূলক শান্ত দেশগুলোতেও। এমনকি সংঘাতের এই ঝাপটায় প্রাণ হারিয়েছেন একজন ফরাসি নাগরিকও।

এক নজরে প্রাণহানির পরিসংখ্যান (দেশভিত্তিক):

  • ইরান: ১৪৪৪ জন

  • লেবানন: ৯৬৮ জন

  • ইরাক: ৬০ জন

  • ইসরায়েল: ১৭ জন

  • মার্কিন বাহিনী: ১৩ জন

  • সংযুক্ত আরব আমিরাত: ৮ জন

  • কুয়েত: ৬ জন

  • সিরিয়া: ৪ জন

  • ফিলিস্তিন, ওমান: ৩ জন (প্রতিটি)

  • বাহরাইন, সৌদি আরব: ২ জন (প্রতিটি)

  • ফ্রান্স: ১ জন

ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব ও সংকটের গভীরতা

এই সংঘাতের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র জুড়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা ছড়িয়ে পড়েছে। এক সময়কার মিত্র দেশগুলোও এখন মার্কিন ঘাঁটি ব্যবহার নিয়ে দ্বিধায় রয়েছে। বিশেষ করে আরব দেশগুলোতে চালানো ইরানি হামলা ওই অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। সমর বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান তার প্রক্সি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে এই যুদ্ধকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে যেখানে মধ্যস্থতা করার সুযোগ ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে।

হামলার তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামেও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। লোহিত সাগর ও পারস্য উপসাগরীয় নৌপথগুলো অনিরাপদ হয়ে পড়ায় বৈশ্বিক বাণিজ্যে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। অনেক বিশেষজ্ঞ একে ‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্বাবাস’ হিসেবেও বর্ণনা করছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *