ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা-newsedge24

কাশ্মীরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা পেহেলগামের বাইসারান উপত্যকায় ২২ এপ্রিল ২০২৫-এ সংঘটিত ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় ২৬ জন নিহত এবং ১৭ জন আহত হয়েছেন, যার মধ্যে বেশিরভাগই পর্যটক। এই হামলা অঞ্চলটির সাম্প্রতিক শান্ত পরিস্থিতিকে ভেঙে দিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি করেছে।

হামলার সময় পাঁচ থেকে ছয়জন বন্দুকধারী ঘন পাইন জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এসে বাইসারানের মনোরম তৃণভূমিতে পিকনিকরত পরিবার, ঘোড়ায় চড়া পর্যটক এবং স্থানীয় খাবারের স্টলে থাকা লোকজনের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, হামলাকারীরা কিছু শিকারকে ইসলামিক আয়াত আবৃত্তি করতে বাধ্য করে এবং যারা তা করতে ব্যর্থ হয়, তাদের কাছাকাছি থেকে গুলি করে হত্যা করে।

‘দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট’ (টিআরএফ) নামে একটি স্বল্প পরিচিত গোষ্ঠী হামলার দায় স্বীকার করেছে। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মনে করে, টিআরএফ পাকিস্তানভিত্তিক সন্ত্রাসী সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বার একটি ছদ্মনাম, যার পেছনে পাকিস্তানের আইএসআই-এর সমর্থন রয়েছে। টিআরএফ ২০১৯ সালে জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের পর গঠিত হয় এবং ২০২৩ সালে ভারত এটিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করে। পাকিস্তান অবশ্য সন্ত্রাসীদের সমর্থনের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, তারা কেবল কাশ্মীরিদের স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে নৈতিকভাবে সমর্থন করে।

হামলার পরপরই ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং ঘোষণা করেন, হামলাকারী এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে ‘কড়া ও স্পষ্ট জবাব’ দেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সৌদি আরব সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফিরে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেন।

ভারত প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে পাকিস্তান হাইকমিশনের প্রতিরক্ষা, নৌ ও বিমান উপদেষ্টাদের বহিষ্কার, অটারি সীমান্ত বাণিজ্য পথ বন্ধ এবং সিন্ধু পানিবণ্টন চুক্তি স্থগিত করার ঘোষণা দেয়। এই চুক্তি দুই দেশের কোটি কোটি মানুষের জীবনযাত্রার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং এর আগে কখনো স্থগিত করা হয়নি, এমনকি যুদ্ধকালীন সময়েও নয়।

হামলাটি এমন সময়ে ঘটেছে যখন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ভারতে চারদিনের সফরে ছিলেন। তিনি হামলাকে ‘বিধ্বংসী’ ও ‘ভয়াবহ’ আখ্যা দিয়ে শোক প্রকাশ করেন এবং ভারতের সঙ্গে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যৌথ লড়াইয়ে সমর্থনের আশ্বাস দেন। মাইকেল কুগেলম্যান, মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক, বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ভারতের পাশে রয়েছে এবং ভারতের প্রতিক্রিয়ায় বাধা দেবে না। ২০০১ সালে ভারতীয় পার্লামেন্টে হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক ভূমিকা পালন করেছিল, তবে এবার তাদের অবস্থান ভারতের প্রতি সমর্থনমূলক।

হামলাটি কাশ্মীরের স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। শোক প্রকাশে এক ডজনের বেশি কাশ্মীরি সংগঠন দোকান ও ব্যবসা বন্ধ রাখে এবং স্থানীয়রা ‘পর্যটকরাই আমাদের জীবন’ স্লোগান দিয়ে প্রতিবাদ মিছিল করে। শিব নাডার ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক সিদ্দিক ওয়াহিদ বলেন, “কাশ্মীরিরা এই ঘটনায় খুবই ক্ষুব্ধ ও মর্মাহত।” হামলাকারীদের উদ্দেশ্য যদি কাশ্মীরিদের সমর্থন বা বিচ্ছিন্নতাবাদ জাগানো হয়, তবে তারা ভুল গণনা করেছে।

১৯৮৯ সাল থেকে কাশ্মীরে ভারতের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম চলছে, যাতে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। ২০১৯ সালে মোদি সরকার জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল ও অঞ্চলটিকে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিভক্ত করে, যা কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং পর্যটন বৃদ্ধির দিকে নিয়ে যায়। ২০২৪ সালে রেকর্ড ৩৫ লাখ পর্যটক কাশ্মীর ভ্রমণ করেন। তবে এই হামলা সরকারের ‘স্বাভাবিক’ পরিস্থিতির দাবিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

ভারতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করেন, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের সাম্প্রতিক বক্তব্য, যেখানে তিনি কাশ্মীরকে পাকিস্তানের ‘জাগুলার ভেইন’ বলে উল্লেখ করেন, এই হামলার পটভূমি তৈরি করেছে। বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, ২০১৯ সালের পুলওয়ামা হামলার মতো ভারত এবারও সীমান্ত পেরিয়ে সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে। তবে, উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে দুই পরমাণু শক্তিধর দেশের মধ্যে বড় ধরনের সংঘাতের ঝুঁকি রয়েছে।

  • পেনেলোপ ম্যাকরে, দিল্লিতে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির দক্ষিণ এশিয়া সম্পাদক।
  • দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনুবাদ: মনজুরুল আহসান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *