যেভাবে হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ করছে ইরান!

প্রায় চার সপ্তাহ ধরে বন্ধ হয়ে আছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি। পারস্য উপসাগর-কেন্দ্রিক উত্তেজনা, ইরানের হুমকি ও জাহাজে হামলার আশঙ্কায় এই পথ দিয়ে নৌযান চলাচল স্থবির হয়ে পড়েছে, যার প্রভাব বিশ্ব জ্বালানি বাজারে তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে।

বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই সংকীর্ণ জলপথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে প্রণালিটি কার্যত অচল হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। শুধু জ্বালানিই নয়, কৃষি খাতের জন্য প্রয়োজনীয় সার পরিবহনের ক্ষেত্রেও এই পথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে সংকটটি বহুমাত্রিক রূপ নিচ্ছে।

এই অচলাবস্থার পেছনে রয়েছে ইরান-কে ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগ। সাম্প্রতিক সময়ে জাহাজে হামলার আশঙ্কা এবং সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজগুলো এই পথ এড়িয়ে চলতে শুরু করেছে। বীমা খরচ বেড়ে যাওয়া এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি বৃদ্ধিও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

সংকট নিরসনে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালির অবরোধ তুলে নিতে আন্তর্জাতিক উদ্যোগের কথা বলেছেন। একই সঙ্গে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন এবং তেলবাহী জাহাজগুলোকে মার্কিন নৌবাহিনীর নিরাপত্তায় পার করে দেওয়ার সম্ভাবনাও বিবেচনা করছেন।

তবে বাস্তবতা হচ্ছে, এই সংকটে ইরানের অবস্থান এখনো শক্তিশালী বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এর অন্যতম কারণ তাদের অপ্রচলিত যুদ্ধকৌশল। সস্তা কিন্তু কার্যকর ড্রোন, সমুদ্রমাইন এবং দ্রুত আঘাত হানতে সক্ষম ছোট নৌযানের মাধ্যমে তারা বড় শক্তিগুলোকেও চ্যালেঞ্জ জানাতে সক্ষম হয়েছে। পাশাপাশি, ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের প্রভাব বাড়িয়েছে, যা সামরিকভাবে এই পথ সম্পূর্ণ নিরাপদ রাখা কঠিন করে তুলেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি শুধু একটি আঞ্চলিক সংকট নয়; বরং এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। তেলের দাম বৃদ্ধি পেলে বিশ্বজুড়ে পরিবহন ব্যয় বাড়বে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে খাদ্যদ্রব্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর। উন্নয়নশীল দেশগুলো এ সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

হরমুজ প্রণালির এই অচলাবস্থা বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছে। দ্রুত সমাধান না হলে এটি বৃহত্তর সামরিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে—যার প্রভাব ছড়িয়ে পড়বে বিশ্বজুড়ে, এবং যার অভিঘাত থেকে কোনো দেশই পুরোপুরি নিরাপদ থাকবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *