গত সপ্তাহে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পেহেলগামে বন্দুকধারীদের হামলায় ২৬ জন বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যু দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আবারও অস্থিতিশীল করে তুলেছে। এই হামলা শুধু ভারতের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাই উন্মোচন করেনি, বরং ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনাকে নতুন করে উসকে দিয়েছে। পেহেলগামের এই ঘটনা ২০১৬ সালের উরি হামলা, ২০১৯ সালের পুলওয়ামা হামলা এবং ২০০৮ সালের মুম্বাই হামলার স্মৃতি পুনরুজ্জীবিত করেছে, যেগুলোর প্রতিটিই দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সম্পর্ককে যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল।
ভারতের অভিযোগ, পাকিস্তান এই হামলাগুলোর পেছনে কৌশলগতভাবে সমর্থন দিয়ে আসছে, যদিও ইসলামাবাদ বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করে। পেহেলগাম হামলার পর দিল্লি দ্রুত প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে—সীমান্ত বন্ধ, ইন্দাস জলচুক্তি স্থগিত, পাকিস্তানি নাগরিকদের ভিসা বাতিল, এবং ভারতীয় আকাশসীমায় পাকিস্তানি উড়োজাহাজের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা। পাকিস্তানও পাল্টা ব্যবস্থা নিয়েছে, যার মধ্যে ভারতের জন্য আকাশসীমা বন্ধ এবং সীমান্তে গোলাগুলি উল্লেখযোগ্য। এই পারস্পরিক প্রতিক্রিয়া অঞ্চলটিকে আরও অস্থির করে তুলছে।
সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক অজয় বিসারিয়ার মতে, পেহেলগাম হামলার সঙ্গে পুলওয়ামা ও মুম্বাই হামলার ভয়াবহ সাদৃশ্য রয়েছে। তবে এবারের হামলার একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো, লক্ষ্যবস্তু ছিল বেসামরিক নাগরিক, বিশেষ করে পর্যটকরা। এটি এমন এক সময়ে ঘটেছে যখন কাশ্মীরে পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছিল। এই হামলা ভারতের জন্য নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক দিক থেকে একটি সংবেদনশীল চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। একদিকে জনগণের ক্ষোভের মুখে কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখানোর চাপ, অন্যদিকে যুদ্ধের ঝুঁকি এড়িয়ে সংযম প্রদর্শনের প্রয়োজনীয়তা—ভারত এখন এই ভঙ্গুর ভারসাম্য রক্ষার কঠিন পরীক্ষার মুখে।
ইন্দাস জলচুক্তি স্থগিতের হুমকি এই সংকটের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক। ১৯৬০ সালে স্বাক্ষরিত এই চুক্তি দুই দেশের মধ্যে পানি বণ্টন নিয়ে একটি স্থিতিশীল কাঠামো প্রদান করেছে। এটি বাতিল হলে পাকিস্তানের কৃষি ও অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হবে, যা উত্তেজনাকে আরও তীব্র করতে পারে। অজয় বিসারিয়া সতর্ক করে বলেছেন, এই ধরনের পদক্ষেপ পাকিস্তানের জন্য গভীর পরিণতি বয়ে আনতে পারে, তবে এটি ভারতের জন্যও ঝুঁকিমুক্ত নয়।
দুই দেশের মধ্যে অতীতের সংঘাত, যেমন ২০১৯ সালের পুলওয়ামা হামলার পর বালাকোটে ভারতের বিমান হামলা এবং পাকিস্তানের পাল্টা প্রতিক্রিয়া, প্রমাণ করে যে সামরিক পদক্ষেপ দ্রুতই অনিয়ন্ত্রিত হয়ে উঠতে পারে। ভারতীয় পাইলট অভিনন্দনের মুক্তি এবং পরবর্তী কূটনৈতিক পদক্ষেপ সেই সময় সংঘাতকে সীমিত করেছিল। কিন্তু পেহেলগাম হামলার পর বর্তমান পরিস্থিতি আরও জটিল। বেসামরিক নাগরিকদের মৃত্যু ভারতের জনমনে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে, যা সরকারের উপর কঠোর পদক্ষেপের চাপ বাড়িয়েছে।
এই সংকটে কূটনীতির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে, যেমন ২০১৯ সালে, পাকিস্তানের ‘শুভেচ্ছা বার্তা’ হিসেবে পাইলট মুক্তি এবং ভারতের কূটনৈতিক পদক্ষেপ উত্তেজনা প্রশমনে সহায়ক ছিল। কিন্তু বর্তমানে দুই দেশের পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং চীনের পাকিস্তানের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বিশ্ব সম্প্রদায়ের উচিত এই সংকটে মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করা। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সংঘাত শুধু দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতাই নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্যও হুমকি। পেহেলগাম হামলা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে সন্ত্রাসবাদ এই অঞ্চলের জন্য একটি ক্রমাগত হুমকি, এবং এর সমাধান কেবল সামরিক শক্তিতে নয়, বরং কূটনৈতিক সংলাপ ও পারস্পরিক সহযোগিতায় নিহিত।
ভারত ও পাকিস্তানের নীতিনির্ধারকদের উচিত অতীতের শিক্ষা থেকে উপকৃত হয়ে সংযম ও দূরদর্শিতার পরিচয় দেওয়া। যুদ্ধের পথ শুধু ধ্বংসই বয়ে আনে, কিন্তু কূটনীতি এই অঞ্চলের জন্য শান্তি ও সমৃদ্ধির পথ উন্মুক্ত করতে পারে। পেহেলগামের শোকাবহ ঘটনা আমাদের সবাইকে এই সত্যটি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানায়।






























































































































































































































































































































































































































































































































































































































































