রাজধানীর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে যাত্রী পারাপারের সময় দুই লঞ্চের ভয়াবহ সংঘর্ষে অন্তত ২ জন নিহত হয়েছেন। বুধবার বিকেলে ঘটা এই দুর্ঘটনায় বুড়িগঙ্গার পানিতে তলিয়ে নিখোঁজ রয়েছেন আরও ৩ জন। ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রেখেছে।
বুধবারের পড়ন্ত বিকেলে যখন সদরঘাটে ঘরমুখো মানুষের উপচে পড়া ভিড়, ঠিক তখনই মরণঘাতী এই দুর্ঘটনাটি ঘটে। ঘড়ির কাঁটায় তখন বিকেল সাড়ে ৫টা। প্রত্যক্ষদর্শী ও ঘাট সূত্রে জানা গেছে, পটুয়াখালীগামী ‘আসা যাওয়া-৫’ লঞ্চটি টার্মিনালের পন্টুন ছেড়ে মাঝনদীতে অবস্থান করছিল। সেখান থেকে ছোট ট্রলারের মাধ্যমে যাত্রী তোলার কাজ চলছিল।
ঠিক সেই মুহূর্তে পেছন থেকে তীব্র গতিতে ধেয়ে আসে ‘জাকির সম্রাট-৩’ নামক আরেকটি লঞ্চ। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই লঞ্চটি সজোরে ধাক্কা দেয় ‘আসা যাওয়া-৫’-কে। দুই লঞ্চের মাঝখানে পড়ে ট্রলারে থাকা যাত্রীরা পিষ্ট হন। ঘটনাস্থলেই লঞ্চের চাপে পিষ্ট হয়ে দুজন প্রাণ হারান। নিহতদের দেহ ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে তাদের পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
নিখোঁজ ও উদ্ধার অভিযান
লঞ্চের প্রচণ্ড ধাক্কায় ট্রলারে থাকা বেশ কয়েকজন যাত্রী নদীতে ছিটকে পড়েন। তাদের মধ্যে তিনজনের আর হদিস পাওয়া যায়নি। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় ফায়ার সার্ভিসের বিশেষ ডুবুরি দল ও নৌ-পুলিশ। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হলেও লাইট জ্বালিয়ে তল্লাশি কার্যক্রম চলছে। নদীর প্রবল স্রোত ও তলদেশের অন্ধকার উদ্ধারকাজকে কিছুটা ব্যাহত করছে।
আহতদের মধ্যে একজনের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। উদ্ধারকর্মীরা এক নারীকে উদ্ধার করে দ্রুত স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতালে পাঠিয়েছেন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তার শরীরে একাধিক স্থানে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন রয়েছে এবং তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
এক নজরে দুর্ঘটনাকবলিত তথ্যসমূহ:
-
সময়: বুধবার, ১৮ মার্চ ২০২৬, বিকেল ৫টা ৩০ মিনিট।
-
স্থান: সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল সংলগ্ন বুড়িগঙ্গা নদী।
-
লঞ্চের নাম: আসা যাওয়া-৫ এবং জাকির সম্রাট-৩।
-
হতাহতের সংখ্যা: ২ জন নিহত (পরিচয় অজ্ঞাত), ১ জন চিকিৎসাধীন।
-
নিখোঁজ: ৩ জন (উদ্ধার অভিযান চলমান)।
সদরঘাটের নিয়মিত যাত্রী ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ঘাটে লঞ্চ ভেড়ানোর ক্ষেত্রে চালকদের অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং ট্রলার দিয়ে যাত্রী ওঠানোর বিপজ্জনক প্রবণতাই এই মৃত্যুর জন্য দায়ী। লঞ্চের মাস্টারদের অসতর্কতা এবং বিআইডব্লিউটিএ-এর যথাযথ তদারকির অভাবেই বারবার এমন ট্র্যাজেডি ঘটছে।
ঘটনার পর ‘জাকির সম্রাট-৩’ লঞ্চটির চালক পালিয়ে গেলেও নৌ-পুলিশ লঞ্চ দুটিকে জব্দ করেছে। বিআইডব্লিউটিএ-এর একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, “প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে এটি যান্ত্রিক ত্রুটির চেয়ে চালকের অদক্ষতা বা বেপরোয়া গতির কারণে ঘটেছে। আমরা একটি তদন্ত কমিটি গঠন করছি, যারা সাত কর্মদিবসের মধ্যে রিপোর্ট জমা দেবে।”
নিহতদের স্বজনদের খোঁজে ঘাটে ভিড় করছেন অনেক সাধারণ মানুষ। আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছে বুড়িগঙ্গার তট। প্রিয়জনের অপেক্ষায় নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক স্বজন আক্ষেপ করে বলেন, “সদরঘাট মানেই কি মৃত্যুর ফাঁদ? প্রতি বছর উৎসব বা সাধারণ দিনে মানুষ মরে, কিন্তু দায়ীদের কোনো শাস্তি হয় না।”
এই দুর্ঘটনায় নৌ-নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বারবার সতর্ক করার পরও কেন মাঝনদীতে ট্রলার দিয়ে যাত্রী ওঠানো বন্ধ করা যাচ্ছে না, তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।



















































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































