মালয়েশিয়া-newsedge24

বাংলাদেশের শ্রমিকদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে। আগামী কয়েক বছরে মালয়েশিয়া বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১২ লাখ শ্রমিক নেবে, যার মধ্যে প্রায় ৫০,০০০ শ্রমিক বিনা খরচে নিয়োগ পাবেন। এই উদ্যোগ বাংলাদেশের রেমিটেন্স প্রবাহ বাড়াতে এবং অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।

বৃহস্পতিবার (১৫ মে ২০২৫) মালয়েশিয়ার পুত্রজয়ায় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং আইন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাইফুদ্দিন নাশুসন ইসমাইল এবং মানবসম্পদ মন্ত্রী স্টিভেন সিম চি কেওয়ার সঙ্গে একটি যৌথ সভায় মিলিত হচ্ছেন। এই সভায় শ্রমিক নিয়োগ সংক্রান্ত একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এর আগে, ৪ অক্টোবর ২০২৪-এ মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ড. আনোয়ার ইব্রাহিম বাংলাদেশ সফরে এসে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন। বৈঠকে শ্রমবাজার উন্মুক্তকরণ, ভিসা সহজীকরণ, বাণিজ্য, শিক্ষা, প্রযুক্তি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং রোহিঙ্গা ইস্যুতে সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা হয়। ড. ইউনূস বলেন, “মালয়েশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নিতে চাই।” ড. আনোয়ার ইব্রাহিম ড. ইউনূসের প্রতি আস্থা প্রকাশ করে বলেন, “বাংলাদেশের শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আমরা কাজ করছি। তারা আধুনিক দাস নয়।”

মালয়েশিয়া বাংলাদেশের শ্রমিকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য। দেশটিতে সাধারণ শ্রমিকদের গড় মাসিক বেতন প্রায় ৫০,০০০ টাকা, যা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর তুলনায় দ্বিগুণ বা তার বেশি। গত এক বছর ধরে শ্রমবাজারে জটিলতার কারণে বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগ বন্ধ ছিল। এই সময়ে প্রায় ৪৫০,০০০ শ্রমিক মালয়েশিয়ায় যাওয়ার সুযোগ হারায়, যা রেমিটেন্স প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

বাংলাদেশের কুয়ালালামপুর দূতাবাসের কর্মকর্তারা জানান, শ্রমবাজার পুরোপুরি উন্মুক্ত হলে বছরে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত রেমিটেন্স আসতে পারে। তারা জোর দিয়ে বলেন, “অভিবাসন ব্যয় কমানো এবং শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।” স্বল্প ব্যয়ে নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে সরকার এবং দূতাবাস কাজ করছে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, “যদি এই শ্রমবাজার সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা যায়, তবে এটি রেমিটেন্স প্রবাহ বাড়িয়ে জাতীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে।”

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিটেন্স একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশে ২.৫২৮ বিলিয়ন ডলার রেমিটেন্স এসেছে, যা দেশের ইতিহাসে চতুর্থ সর্বোচ্চ মাসিক প্রবাহ। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত হলে এই প্রবাহ আরও বাড়বে। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক রেমিটেন্স ২.৮% বৃদ্ধি পেয়ে ৬৯০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে, এবং বাংলাদেশ এতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের রেমিটেন্স বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উদাহরণস্বরূপ, একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মালয়েশিয়ায় অভিবাসী শ্রমিকরা তাদের পরিবারের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে। সরকারের অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ১৫০ বিলিয়ন ডলার রেমিটেন্স আয়ের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, এবং মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার এই লক্ষ্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি শ্রমিকদের নিয়োগে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। গত এক বছরে শ্রমবাজার বন্ধ থাকার কারণে হাজার হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক মালয়েশিয়ায় অবৈধভাবে অবস্থান করছেন, যারা কাজ হারিয়ে অসহায় অবস্থায় রয়েছেন। এছাড়া, শ্রমিক নিয়োগে সিন্ডিকেট এবং অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় একটি বড় সমস্যা। ২০২১ সালের বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া শ্রম চুক্তি পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *