বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাছাকাছি পর্যায়ে পৌঁছেছে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র (রুপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র)। প্রকল্পের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে এই প্রকল্পের প্রথম ইউনিটে ফুয়েল লোডিংয়ের কাজ শুরু হতে পারে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী এপ্রিলের শেষ নাগাদ পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হতে পারে। যার মাধ্যমে প্রথমবারের মতো জাতীয় গ্রিডে আংশিকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট’রা। একইসাথে কর্মকর্তারা জানান, পারমাণবিক কার্যক্রম অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং এখানে নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পায়। তাই চালুর সাথে সাথেই কেন্দ্রটি পূর্ণ সক্ষমতায় পৌঁছাবে না।
কার্যক্রম পরিচালনার রোডম্যাপ অনুযায়ী, বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ফিজিক্যাল স্টার্টআপের পর ধাপে ধাপে এর উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়ে ১,২০০ মেগাওয়াটে পৌঁছাতে আরও ৮ থেকে ১০ মাস সময় লাগতে পারে। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি নাগাদ প্রথম ইউনিট থেকে পুরোদমে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হতে পারে।
তবে প্রযুক্তিগত জটিলতার কারণে সময়সূচিতে কিছুটা হেরফের হওয়ার শঙ্কাও রয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। যদি ট্রায়াল অপারেশনে যাওয়ার আগপর্যন্ত জ্বালানি লোডিং, রিঅ্যাক্টর চালু কিংবা পরীক্ষামূলক উৎপাদনের সময় কোনো ধাপে কারিগরি ত্রুটি বা অসংগতি ধরা পড়ে, সেক্ষেত্রে সময়সূচি পরিবর্তিত হবে। তারা বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রটি কমিশনিংয়ের প্রতিটি ধাপে গতির চেয়ে নিরাপত্তা ও গুণগত মান নিশ্চিত করার বিষয়টিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) কর্মকর্তারা জানান, ফুয়েল লোডিং সম্পন্ন হতে সময় লাগবে প্রায় এক মাস। এরপর শুরু হবে রিঅ্যাক্টর স্টার্টআপ ও পানি গরম করার ধাপ, যা শেষ হতে আরও প্রায় এক মাস সময় লাগবে। এরপর ধাপে ধাপে ট্রায়াল অপারেশন শুরু হবে এবং সেই পর্যায়েই প্রথমবারের মতো আংশিক বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ শুরু হতে পারে।অপারেশনাল পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিদ্যুৎ উৎপাদন ধীরে ধীরে বাড়ানো হবে—প্রথমে মোট সক্ষমতার ১০ শতাংশ, এরপর ৪০ শতাংশ, ৭০ শতাংশ এবং সর্বশেষে ১০০ শতাংশে উন্নীত করা হবে।
তবে কর্মকর্তারা বলেন, কারিগরি জটিলতার কারণে এই সময়সীমা পরিবর্তিত হতে পারে। এছাড়া পরীক্ষামূলক উৎপাদনের পুর্বে কোনো ত্রুটি ধরা পড়লে সময়সূচি পুনর্নির্ধারণ করা হবে।একইভাবে ২০২৬ সালের শেষের দিকে রূপপুরের দ্বিতীয় ইউনিটে ফুয়েল লোডিংয়ের মাধ্যমে উৎপাদন কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান সংশ্লিষ্টরা।
অপারেশন পর্যায়ের কর্মকর্তারা আরও জানান, ট্রায়াল অপারেশন চলাকালে বিদ্যুৎ পাওয়া গেলেও তা নিয়মিত বা পূর্ণাঙ্গ নাও হতে পারে। ট্রায়াল শেষে আনুষ্ঠানিক হস্তান্তর সম্পন্ন হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন আরও স্থিতিশীল হবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনপিসিবিএলের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘আগামী পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে বাকি আনুষঙ্গিক পরীক্ষামূলক কাজ শেষ করে ফ্রেব্রুয়ারির প্রথম দিকে রূপপুর প্রকল্পে ফুয়েল লোডিংয়ে যাবে। বর্তমানে কেন্দ্রটির কাজ ধাপে ধাপে অপারেশনাল পর্যায়ে অগ্রসর হচ্ছে, তবে পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় কোনো ধাপেই তাড়াহুড়া করা হচ্ছে না।’
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, বর্তমানে কেন্দ্রটিতে প্রায় ৩০টির মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্রিটিক্যাল টেস্ট বাকি রয়েছে। এসব পরীক্ষা শেষে প্রতিটি সিস্টেম খুলে বিস্তারিত পরিদর্শন করা হবে। কোনো ত্রুটি বা বিচ্যুতি ধরা পড়লে তা সংশোধনের পর ফের পরীক্ষা চালানো হবে। সব ধাপ সফলভাবে শেষ হওয়ার পরই চূড়ান্তভাবে ফুয়েল লোডিং ও পরবর্তী ধাপে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্তণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, রূপপুরে নিয়োগ পাওয়া রুশ ঠিকাদার জানিয়েছে, শিগগিরই প্রথম ইউনিটে ফুয়েল লোডিং শুরু হবে। তবে তারা এখনো আনুষ্ঠানিক তারিখ ঘোষণা করেনি। যেসব টেস্ট এখনো করা হয়নি, সেগুলো শেষ করেই তারা ফুয়েল লোডিংয়ের ঘোষণা দেব। তারা বলেন, রূপপুর যেহেতু উচ্চমাত্রার সংবেদনশীল ও জটিল প্রযুক্তিনির্ভর প্রকল্প, তাই নিরাপত্তা ও মান যাচাইয়ের প্রশ্নে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। অত্যন্ত সংবেদনশীল এই প্রকল্পে সময়ের চেয়ে নিরাপদ ও নির্ভুল বাস্তবায়নকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
২০১৬ সালে ১ লাখ ১৩ হাজার ৯৩ কোটি টাকা প্রাথমিক ব্যয়ে রূপপুর প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হয়। মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রথম ইউনিট ও ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দ্বিতীয় ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা ছিল। তবে বাস্তবায়ন বিলম্বিত হওয়ায় এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হয়নি।বর্তমানে বিনিময় হারের সমন্বয় এবং যন্ত্রাংশের মূল্য বৃদ্ধির কারণে প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, বিনিময় হার সমন্বয়ের ফলে এ প্রকল্পের মোট ব্যয় ২৬ হাজার ১৮১.২৬ কোটি টাকা বাড়তে যাচ্ছে, যা মূল বরাদ্দে তুলনায় ২৩.১৫ শতাংশ বেশি।

বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) তথ্যমতে, প্রতিটি ইউনিট থেকে ১,২০০ মেগাওয়াট করে মোট ২,৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে এ কেন্দ্র থেকে। ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে ৭৩.৬২ শতাংশ এবং ভৌত অগ্রগতি ৭৪.২৪ শতাংশ।
বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে আন্তঃসরকার চুক্তির অধীনে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন রাশিয়ার অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট-এর সঙ্গে দুটি ইউনিট নির্মাণ, সরঞ্জাম সরবরাহ, প্রশিক্ষণ ও জ্বালানি সরবরাহের বিষয়ে চুক্তি সই করে।
কর্মকর্তারা জানান, কোভিড-১৯ মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও ডলার সংকটের কারণে প্রকল্পের কাজের গতি ধীর হয়ে যায়। ফলে ২০২৫ সালের ৩ জুন অনুষ্ঠিত দুই দেশের ৯০তম যৌথ সমন্বয় বৈঠকে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুযায়ী, দ্বিতীয় ইউনিটের প্রাথমিক হস্তান্তরের সময় ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। আর প্রকল্পের কাজ সমাপ্তির নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৮ সালের জুন।
আইএমইডির অক্টোবর মাসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রূপপুরের প্রথম ইউনিটের নির্মাণকাজ প্রায় শেষ। অধিকাংশ ভবন ও প্রধান যন্ত্রপাতি স্থাপনের কাজও সমাপ্তির পথে। সামগ্রিকভাবে প্রথম ইউনিটের মূল কাঠামোর ৯৫ শতাংশের বেশি কাজ এবং প্রধান নিরাপত্তা পরীক্ষাগুলো সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। অক্সিলিয়ারি ও টারবাইন ভবনের কাজও শেষের দিকে।বর্তমানে চূড়ান্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।
দ্বিতীয় ইউনিটের নির্মাণকাজও বেশ অগ্রসর হয়েছে। অধিকাংশ মূল অবকাঠামো ও সাধারণ (শেয়ারড) স্থাপনাগুলোর কাজ প্রায় শেষ। ভবন নির্মাণের কাজও প্রায় সম্পন্ন হয়েছে,সরঞ্জাম স্থাপনের কাজ এগিয়ে চলছে। প্রকল্প পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ইউনিট চালু হওয়ার প্রায় এক বছর পর দ্বিতীয় ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে।
দুটি ইউনিটের জন্য মোট চারটি কুলিং টাওয়ার নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে; এখন সেগুলোর চূড়ান্ত ফিটিং ও পরীক্ষার কাজ চলছে। সামগ্রিকভাবে কুলিং টাওয়ারের কাজ প্রায় ৯০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে।
এছাড়া ফুয়েল স্টোরেজ, নিরাপত্তা ও জরুরি ভবন, পাওয়ার সুইচইয়ার্ড, ওয়ার্কশপ ও অন্যান্য সহায়ক অবকাঠামোসহ ১৩৩টি সাধারণ (শেয়ারড) স্থাপনার নির্মাণকাজ প্রায় সম্পন্ন হয়ে গেছে। এর মধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এখন কমিশনিংয়ের চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
আলমগীর হুসাইন অর্থ
পাবনা জেলা সংবাদদাতা





















































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































