যুক্তরাষ্ট্রের অস্থায়ী ছাড়ে ইরানি তেলের ‘ভাসমান স্টক’ বাজারে আসছে

যুক্তরাষ্ট্র গতকাল শুক্রবার ইরানি তেলের ওপর থেকে ৩০ দিনের জন্য নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করে নেওয়ায় সমুদ্রে ভাসমান প্রায় ১৩-১৭ কোটি ব্যারেল ইরানি অপরিশোধিত তেল এখন খালাস ও বিক্রির জন্য উন্মুক্ত হয়েছে। জ্বালানি বিশ্লেষক সংস্থা কেপলারের সর্বশেষ তথ্য অনুসারে এই পরিমাণ প্রায় ১৭০ মিলিয়ন ব্যারেল, যা বিশ্ববাজারে সরবরাহ বাড়িয়ে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতসহ এশিয়ার দেশগুলো এই তেল কেনার জন্য তৎপর হয়ে উঠেছে।

বর্তমানে বিশ্ব জ্বালানি বাজার এক অভূতপূর্ব সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার পর ইরান প্রণালী হরমুজ কার্যত বন্ধ করে দেয়ায় পারস্য উপসাগর থেকে তেলের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়েছে। এতে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল সরবরাহের পথে বিঘ্ন ঘটেছে, ফলে অপরিশোধিত তেলের দাম আকাশছোঁয়া হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্টের ঘোষণা অনুসারে, সমুদ্রে ভাসমান ইরানি তেলের ওপর ৩০ দিনের ওয়েভার দেওয়া হয়েছে—যা ১৯ মার্চের আগে লোড করা তেলের জন্য প্রযোজ্য এবং ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত বৈধ। এই ছাড়ের ফলে ৩-৪ দিনের মধ্যেই এশিয়ার রিফাইনারিতে তেল পৌঁছাতে শুরু করবে বলে মার্কিন জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট জানিয়েছেন।

জ্বালানি পর্যবেক্ষণ সংস্থা কেপলারের তথ্য বলছে, ইরানি ক্রুড ও কনডেনসেটের ভাসমান স্টক এখন রেকর্ড উচ্চতায়—প্রায় ১৭০ মিলিয়ন ব্যারেল। এর মধ্যে অনেকগুলো ট্যাঙ্কার মধ্যপ্রাচ্য থেকে দূরে, বিশেষ করে সিঙ্গাপুর-মালয়েশিয়া অঞ্চলে অবস্থান করছে। এই স্টক যুদ্ধের আগে থেকেই গড়ে উঠছিল, যখন ইরান হামলার ঝুঁকি এড়াতে তেলকে জাহাজে রেখে সুরক্ষিত রাখতে চেয়েছিল। অন্যদিকে, পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এনার্জি আসপেক্টস ১৯ মার্চের হিসাবে এই পরিমাণ ১৩০-১৪০ মিলিয়ন ব্যারেল বলে অনুমান করেছিল। দুই সংস্থার প্রাক্কলনের মধ্যে সামান্য পার্থক্য থাকলেও এটি বিশাল পরিমাণ তেল, যা বাজারে এলে সরবরাহের চাপ কমাতে পারে।

এই তেল মূলত এশিয়ার দিকে যাচ্ছে। ভারতের রিফাইনারিরা ইতিমধ্যে কেনার পরিকল্পনা করছে, কারণ যুদ্ধের কারণে রাশিয়ান তেলের পরিমাণও সীমিত হয়ে পড়েছে। চীনের মতো বড় ক্রেতারাও এই সুযোগ নিতে পারে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ৩০ দিনের ছাড় সাময়িক সমাধান মাত্র। হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি খুলে না গেলে দীর্ঘমেয়াদি সংকট অব্যাহত থাকবে। ইরানের তেল রপ্তানি এখনও চলছে, কিন্তু অন্য দেশের তেলের প্রবাহ কমে গেছে। ফলে ফ্লোটিং স্টোরেজের এই তেল বাজারে আসা দামের ওঠানামা কমাতে সাহায্য করলেও, যুদ্ধের প্রভাব পুরোপুরি কাটেনি।

গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসমূহ:

  • কেপলারের অনুমান: সমুদ্রে ভাসমান ইরানি তেল ≈ ১৭০ মিলিয়ন ব্যারেল।
  • এনার্জি আসপেক্টসের প্রাক্কলন: ১৩০-১৪০ মিলিয়ন ব্যারেল।
  • যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েভার: ৩০ দিনের জন্য, ১৯ মার্চের আগে লোড করা তেলের জন্য প্রযোজ্য।
  • সম্ভাব্য প্রভাব: এশিয়ায় ৩-৪ দিনের মধ্যে সরবরাহ শুরু, দাম নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।
  • প্রেক্ষাপট: হরমুজ প্রণালীতে যুদ্ধজনিত বাধা, বিশ্ব তেল সরবরাহের ২০% প্রভাবিত।

এই অস্থায়ী ছাড় বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে কিছুটা স্বস্তি দিলেও, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত অনিশ্চয়তা থেকে যাবে। তেলের দামের ওঠানামা অব্যাহত থাকলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে চাপ বাড়বে। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্যও এটি সতর্কতার বিষয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এখন দ্রুত কূটনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করতে হবে, যাতে জ্বালানি সরবরাহের এই সংকট স্থায়ী না হয়। স্থিতিশীলতা ফিরলে তবেই বিশ্ব অর্থনীতি স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে পারবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *