তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম-newsedge4

তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের একাত্তরের যুদ্ধাপরাধ সংক্রান্ত বক্তব্যে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে জামায়াতে ইসলামী। গতকাল (১২ মে ২০২৫) দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে রাজনৈতিক নীতি-নির্ধারণী ফোরামের জরুরি বৈঠকে এই বক্তব্যকে ‘দুঃখজনক’ ও ‘বিভাজনমূলক’ আখ্যা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করা হয়। বৈঠকে নেতারা বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকতে একাত্তরের ইস্যু বারবার উত্থাপন করে দেশে বিভাজনের রাজনীতি চালু করেছিল। তবে ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান এই বিভাজন ভেঙে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছে। এমন সময়ে সরকারের একজন দায়িত্বশীল উপদেষ্টার এ ধরনের বক্তব্য জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী।

বৈঠকে জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, “ছাত্র-জনতা যে স্বপ্ন নিয়ে রক্ত ও জীবন দিয়েছে, তা এখনো পূরণ হয়নি। যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি। এই সময়ে একাত্তরের মতো পুরনো বিষয় তুলে বিভাজন সৃষ্টি করা জাতির ঐক্যের বিরুদ্ধে। এ ধরনের কথা জনগণ অনেক আগেই প্রত্যাখ্যান করেছে।” তিনি ফ্যাসিবাদ চিরতরে নির্মূল করতে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান। বৈঠকে নেতারা আরও অভিযোগ করেন, মাহফুজ আলমের এই বক্তব্যের পেছনে আওয়ামী লীগ ও ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার ‘সুদূরপ্রসারী তৎপরতা’ রয়েছে।

জামায়াতে ইসলামীর আমীর ড. শফিকুর রহমান তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় দলীয় নেতাকর্মীদের কোনো উস্কানি বা অপ্রীতিকর ঘটনায় জড়াতে নিষেধ করেছেন। গতকাল তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক স্ট্যাটাসে তিনি বলেন, “বাংলাদেশের সামগ্রিক পরিবেশ স্বাধীনতার পর থেকে কখনো কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছায়নি। সমাজ ও রাজনীতিতে অনেক কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ও অগ্রহণযোগ্য। এই অবস্থায় নেতাকর্মীদের ধৈর্য, সহনশীলতা, আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল ও ইনসাফের ওপর দৃঢ় থাকতে হবে। কোনো উস্কানি বা অপ্রীতিকর ঘটনায় জড়ানো ঠিক হবে না।”

মাহফুজ আলম গত শনিবার (১০ মে ২০২৫) তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধ ও মুজিববাদী বাম ইস্যুতে একটি স্ট্যাটাস দেন। তিনি লিখেন, “একাত্তরের প্রশ্ন মীমাংসা করতেই হবে। যুদ্ধাপরাধের সহযোগীদের ক্ষমা চাইতে হবে। বাংলাদেশে রাজনীতি করতে হলে পাকিস্তানপন্থা বাদ দিতে হবে। পাকিস্তান এদেশে গণহত্যা চালিয়েছে। সহযোগীদের গণহত্যার পক্ষে বয়ান উৎপাদন বন্ধ করতে হবে।” তিনি মুজিববাদী বামদেরও সমালোচনা করে বলেন, “লীগের গুম-খুন ও শাপলায় মোদিবিরোধী আন্দোলনে হত্যাযজ্ঞের মস্তিষ্ক এরা। জুলাইয়ের পক্ষের শক্তির বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছে।”

রোববার (১১ মে ২০২৫) তিনি আরেকটি স্ট্যাটাসে লিখেন, “পাকিস্তানপন্থিরা যেখানেই থাকবে, সেখানেই আঘাত করা হবে।” তবে তীব্র সমালোচনার মুখে তিনি এই স্ট্যাটাসটি ফেসবুক থেকে সরিয়ে নেন। এই বক্তব্যের পর জামায়াত ছাড়াও সামাজিক মাধ্যমে অনেকে পক্ষে-বিপক্ষে মন্তব্য করেছেন। কেউ কেউ মাহফুজের বক্তব্যকে আওয়ামী লীগের পুনরুত্থানের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ মনে করছেন এটি জামায়াতের যুদ্ধাপরাধের দায় ফিরিয়ে আনার কৌশল।

জামায়াতে ইসলামী দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে, একাত্তরে তাদের ভূমিকা নিয়ে ‘বিকৃত তথ্য’ ছড়ানো হয়েছে। তারা দাবি করে, তারা পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতা করেনি, বরং দেশের ঐক্য ও স্থিতিশীলতার জন্য কাজ করেছে। তবে ইতিহাসবিদ ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষকদের মতে, জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের ছাত্র সংগঠন (তৎকালীন ইসলামী ছাত্র সংঘ) আলবদর, আলশামস ও রাজাকার বাহিনীর মাধ্যমে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সহায়তা করেছিল, যার মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা ও বুদ্ধিজীবীদের হত্যা এবং গণহত্যায় সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে।

এই বিতর্কে বিএনপিও জামায়াতের পাশে দাঁড়িয়েছে। গত জানুয়ারিতে বিএনপির মেজর (অব.) হাফিজ বলেছিলেন, “আমরা ভেবেছিলাম, জামায়াত একাত্তরের ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাইবে। কিন্তু তারা তা না করে তাদের ভূমিকাকে জাস্টিফাই করছে।” তবে সাম্প্রতিক ঘটনায় বিএনপি জামায়াতের সঙ্গে ঐক্যের সুরে কথা বলছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মাহফুজ আলমের বক্তব্য একাত্তরের ইস্যুকে আবার সামনে এনে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়েছে। এটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জকেও প্রকাশ করে, কারণ মাহফুজ ও আসিফ মাহমুদের মতো ছাত্র উপদেষ্টাদের ভূমিকা নিয়ে ইতিমধ্যে গণ অধিকার পরিষদের নুরুল হক নুর পদত্যাগের দাবি তুলেছেন। তবে মাহফুজ আলম তার বক্তব্যের সমর্থনে বলেছেন, “না থাকলে রাষ্ট্র অভ্যুত্থানবিরোধীদের হাতে চলে যেত।”

এই ঘটনা জাতীয় ঐক্যের প্রশ্নে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। জামায়াতের নেতারা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানালেও, একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের ইস্যু এখনো বাংলাদেশের রাজনীতিতে গভীর বিভাজনের কারণ হিসেবে রয়ে গেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *