২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে আর্থিক খাতের ভঙ্গুরতা কাটেনি বলে সমালোচনা করেছে বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (বিএনপি)। বুধবার রাজধানীর গুলশানে চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই বাজেটের সমালোচনা করে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন।
বিএনপির বক্তব্যে বলা হয়, এই বাজেটে আর্থিক খাতের ভঙ্গুরতা দূর করার কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজারে অবহেলিত রয়ে গেছেন। বাজেটে পুঁজিবাজারের উন্নয়নে কোনো কৌশলগত পদক্ষেপ বা প্রণোদনার প্রস্তাব নেই, যদিও বিনিয়োগকারীরা প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে হস্তক্ষেপ কামনা করেছিলেন। ব্যাংক খাতের আর্থিক অবস্থা দুর্বল রয়েছে। খেলাপি ঋণ আদায় ও পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় রাজস্ব আহরণের নতুন ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব হয়নি। সরকার ব্যাংক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল, যা ‘ঋণ করে ঋণ শোধ’ নীতির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি। বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রাখা হয়েছে, যা কর ফাঁকি প্রদানকারীদের পুরস্কৃত করছে এবং নিয়মিত করদাতাদের প্রতি অবিচার। এটি কর ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা কমাতে পারে। এছাড়া করজাল সম্প্রসারণের পরিবর্তে ভ্যাট বৃদ্ধির মাধ্যমে সাধারণ জনগণের ওপর করের বোঝা চাপানো হয়েছে। এলইডি বাতি, নির্মাণসামগ্রী, রড, সিমেন্ট, স্ক্রু, বোল্ট ইত্যাদি পণ্যের শুল্ক বৃদ্ধি জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়াবে।
আমির খসরু বলেন, বাজেটটি একমুখী, অংশগ্রহণহীন ও গতানুগতিক। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাজনৈতিক দল, বিশেষজ্ঞ, নাগরিক সমাজ, ব্যবসায়ী ও তরুণ প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে বাজেট প্রণয়ন করতে পারত। এতে বাজেট সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিচ্ছবি হতো এবং নতুন চিন্তার প্রতিফলন ঘটত।
বিএনপি উল্লেখ করেছে যে, বাজেটে দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতি, দারিদ্র্য বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান হ্রাস এবং জীবনযাত্রার মান কমার সমস্যাগুলোর সমাধানে কোনো সুস্পষ্ট রূপরেখা নেই। তারা নিম্নলিখিত বিষয়গুলো তুলে ধরেছে:
- মূল্যস্ফীতি ও দারিদ্র্য: দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে ৯ শতাংশের ওপরে মূল্যস্ফীতির কারণে সীমিত আয়ের মানুষ হিমশিম খাচ্ছে। মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির তুলনায় কম থাকায় প্রকৃত আয় হ্রাস পেয়েছে।
- কর্মসংস্থান হ্রাস: দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ স্থবিরতার কারণে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থান কমেছে, যা সমাজে ভাঙন ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বৃদ্ধি করছে।
- কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা: কৃষি উৎপাদন প্রবৃদ্ধি গত এক দশকে সর্বনিম্ন, যা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি। সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ অপর্যাপ্ত এবং ত্রুটিপূর্ণ।
- শিক্ষা ও স্বাস্থ্য: শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতে বরাদ্দ কমানো উদ্বেগজনক। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কর মওকুফ না করায় তরুণদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের আকাঙ্ক্ষা পূরণে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে।
বিএনপি মনে করে, উচ্চ সুদের হার, অতিরিক্ত কর ও শুল্ক শিল্প ও উৎপাদনশীল খাতের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। এর ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হতে পারে এবং কর্মসংস্থান কমতে পারে। অনলাইন ব্যবসার ওপর শুল্ক বৃদ্ধি ডিজিটাল উদ্যোক্তাদের হতাশ করবে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও ডিজিটাল রূপান্তরে বাধা হবে। ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানোর কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা না থাকায় উদ্যোক্তারা প্রতিকূল পরিবেশের মুখোমুখি হবেন।
আমির খসরু জানান, বিএনপি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে সর্বক্ষেত্রে সহযোগিতা করছে। তারা প্রত্যাশা করেছিল যে, বাজেটে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো, শিল্প-কারখানা স্থাপন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্পে সহায়তার মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টির উপর জোর দেওয়া উচিত ছিল। তবে, বাজেটে এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট দিক-নির্দেশনার অভাব রয়েছে
বিএনপি ছাড়াও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতে বরাদ্দ কমানোকে উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছে। মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি, ঢাকা (এমসিসিআই) বলেছে, করহার বৃদ্ধির মাধ্যমে নিয়মিত করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত বোঝা চাপানো হয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) কালো টাকা সাদা করার সুযোগকে অনৈতিক ও সংবিধানবিরোধী বলে সমালোচনা করেছে।



















































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































