সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে এক ঘণ্টা ‘বোনাস’ সময়, বিকেল ৪:৩০ পর্যন্ত ভোটগ্রহণ

এক নতুন বাংলাদেশের নতুন ভোটাধিকার প্রয়োগের মাহেন্দ্রক্ষণ উপস্থিত। দীর্ঘ দেড় বছরেরও বেশি সময় পর ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের আমূল সংস্কারের লক্ষে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বা নতুন সাংবিধানিক রূপরেখার ওপর রায় দিতে গণভোটের মুখোমুখি হচ্ছে দেশ। নজিরবিহীন এই দ্বিমুখী ভোটযজ্ঞের সুবিধার্থে এবার ভোটগ্রহণের সময় এক ঘণ্টা বাড়িয়ে ৯ ঘণ্টা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।

রাত পোহালেই সারাদেশের ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রে শুরু হবে ব্যালটের লড়াই। আগামীকাল সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ চলবে। সাধারণত সকাল ৮টায় ভোট শুরু হলেও এবার গণভোট ও সাধারণ নির্বাচন একই দিনে হওয়ায় এবং ভোটারদের বাড়তি চাপ সামলাতে সময় এগিয়ে এনেছে ইসি। জেন-জি বা তরুণ প্রজন্মের বিপ্লব-পরবর্তী এই প্রথম নির্বাচনে উৎসব ও উত্তেজনার পারদ এখন তুঙ্গে।

দ্বিমুখী ভোটের রণকৌশল

এবারের নির্বাচনে বড় পরিবর্তন হলো ব্যালট পেপারের বৈচিত্র্য। ভোটারদের হাতে দেওয়া হবে দুটি ব্যালট। সাদা রঙের ব্যালটটি হবে নিজের নির্বাচনী এলাকার পছন্দের সংসদ সদস্য পদপ্রার্থীকে ভোট দেওয়ার জন্য। অন্যদিকে, গোলাপি রঙের ব্যালটটি হবে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বা রাষ্ট্র সংস্কারের প্রস্তাবনাসমূহের ওপর গণভোটের জন্য। সেখানে ভোটাররা ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ লিখে নিজের মতামত জানাবেন।

ডিজিটাল ও পোস্টাল ভোটের বিপ্লব

বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে এবারই প্রথম আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ‘পোস্টাল ভোট’ ব্যবস্থা বৃহৎ পরিসরে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিশেষ করে প্রবাসী ভোটার এবং যারা নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের কারণে কেন্দ্রে থাকতে পারবেন না, তাদের জন্য ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধনের সুযোগ রাখা হয়েছে।

ইসি সচিবালয় জানিয়েছে, এবার প্রায় ১৫ লাখ ৩৩ হাজারেরও বেশি ভোটার পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে নিবন্ধন করেছেন। এর মধ্যে ৭ লাখ ৭২ হাজার প্রবাসী এবং ৭ লাখ ৬১ হাজার স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও কারাবন্দী ভোটার রয়েছেন। যারা নিজ ভোটকেন্দ্রে যেতে অক্ষম, তাদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতেই এই যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

বিশ্লেষণ ও আগামীর ভাবনা

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এক ঘণ্টার বাড়তি সময় এবং পোস্টাল ভোটের অন্তর্ভুক্তি ভোটার উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে। বিশেষ করে প্রবাসীদের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করা একটি দীর্ঘদিনের দাবি ছিল। তবে একই সাথে দুটি ভোট হওয়ায় প্রিজাইডিং অফিসার ও পোলিং এজেন্টদের ওপর চাপ বাড়বে। ইসি সচিব আখতার আহমেদ আশ্বস্ত করেছেন যে, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও স্বচ্ছ ব্যালট বক্সের মাধ্যমে এই জটিলতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।

আগামীকালকের এই ৯ ঘণ্টা কেবল নতুন প্রতিনিধি নির্বাচনের নয়, বরং ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রের গতিপথ বদলানোর ঐতিহাসিক মুহূর্ত। ভোটারদের সুবিধার জন্য ইসির নেওয়া এই সময় বর্ধিতকরণ ও পোস্টাল ভোটের সিদ্ধান্তটি যদি সফল হয়, তবে তা বাংলাদেশের নির্বাচনী সংস্কৃতির জন্য একটি ধ্রুবতারা হয়ে থাকবে। এখন কেবল অপেক্ষা কেন্দ্রের গেট খোলার—জনগণ ব্যালটের মাধ্যমে কোন ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়ায়, তাই দেখার বিষয়।

এক নজরে নির্বাচনী প্রস্তুতি:

  • ভোটের সময়: সকাল ৭:৩০ থেকে বিকেল ৪:৩০ (মোট ৯ ঘণ্টা)।

  • ভোটার সংখ্যা: প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৯ জন।

  • প্রার্থী সংখ্যা: ২৯৯টি আসনে মোট ২ হাজার ২৮ জন প্রতিদ্বন্দ্বী (শেরপুর-৩ স্থগিত)।

  • নিরাপত্তা: সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশের সমন্বয়ে ৩ স্তরের নিরাপত্তা বেষ্টনী।

  • গণভোট: ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নের লক্ষে গোলাপি ব্যালটে ‘হ্যাঁ/না’ ভোট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *