এনসিপির দাবি আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ ও সংস্কারের আগে নির্বাচন হবে না-newsedge24

রাজধানীর গুলিস্তানে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ ফটকে আজ শুক্রবার জুমা নামাজের পর থেকে চলমান সমাবেশে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নেতারা ঘোষণা দিয়েছেন যে, আওয়ামী লীগের বিচার ও সংস্কারের আগে এই দেশে কোনো নির্বাচন হবে না। সমাবেশে এনসিপির ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন থানার নেতা-কর্মীদের উপস্থিতি রয়েছে, এবং এখন কেন্দ্রীয় নেতারা বক্তব্য রাখছেন।

এনসিপির নেতারা জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে টালবাহানা চলছে, যা তাদের কাছে অস্বীকার্য। তাদের মতে, গত বছরের ৫ আগস্ট জনগণ আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, যদি কেউ আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করে, তবে জুলাই যোদ্ধারা তা প্রতিহত করবে।

সমাবেশে বক্তব্য রাখেন এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক তারিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, “গণহত্যাকারী ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধের ব্যাপারে অন্তর্বর্তী সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর টালবাহানা লজ্জাজনক। হাইকোর্ট দেখাবে না, কারণ জুলাই বিপ্লব হাইকোর্টের দ্বারা হয়নি।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, জুলাই প্রজন্ম আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধকরণের ব্যাপারে দ্রুত পদক্ষেপ চায় এবং কোনো আমলাতন্ত্রিক জটিলতা গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি দাবি করেন, সব দলের ঐক্যের ভিত্তিতে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়া উচিত, এবং তার বিচার ও সংস্কারের পরই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া উচিত।

এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক তাজনূভা জাবীনও সমাবেশে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, “খুনি হাসিনাকে আমরা বিদায় করেছি। এই বিজয় ধরে রাখতে হবে। আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের চেষ্টা চলছে, কিন্তু এই বাংলার মাটিতে আওয়ামী লীগ আর রাজনীতি করতে পারবে না, ইনশা আল্লাহ।”

এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক আশরাফ উদ্দীন মাহাদী বলেন, “খুনি হাসিনাকে বাংলাদেশে এনে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলাতে হবে। মৌলিক সংস্কার ছাড়া আবার নির্বাচনের দিকে গেলে শহীদদের রক্তের সঙ্গে গাদ্দারি হবে।” আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক আতিক মুজাহিদ জানান, “আমাদের রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য আওয়ামী লীগ ও হাসিনার দোসররা হুমকি। এরা বাংলাদেশে থাকতে পারবে না।”

এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব হুমায়রা নূর বলেন, “আওয়ামী লীগ দীর্ঘ ১৫ বছর দেশের মানুষকে শোষণ করেছে। তাদের ভোট দেওয়ার অধিকার কেড়ে নিয়েছে। এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি বন্ধ করতে দুর্নীতিপরায়ণ, খুনি-গণহত্যাকারী আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা উচিত। দিল্লির ‘প্রেসক্রিপশন’ বাংলাদেশে আর চলবে না।”

অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্দেশে যুগ্ম সদস্যসচিব মাহিন সরকার বলেন, “আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা নিয়ে ন্যূনতম টালবাহানা করবেন না। মৌলিক সংস্কারের আগে কোনো নির্বাচন হবে না।” তাহসীন রিয়াজ, যুগ্ম সদস্যসচিব, জানান, “আগামীর রাজনীতি হবে আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশ থেকে ছুড়ে ফেলার রাজনীতি। আওয়ামী লীগ সমর্থক সাংবাদিকদের দেশ থেকে বিতাড়িত করার রাজনীতি।”

দলের সংগঠক রফিকুল ইসলাম আইনী বলেন, “গণহত্যাকারী আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হতে হবে। এটাই হবে সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।” যুগ্ম মুখ্য সংগঠক আলী নাছের খান জানান, “বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের রাজনীতি চলবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত শহীদ পরিবারের হাতে থাকবে।”

সংগঠক মোস্তাক আহমেদ শিশির বলেন, “এই দেশে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হবে, সেই সিদ্ধান্ত জনগণ ৫ আগস্টই দিয়েছে। পুনর্বাসনের চেষ্টা হলে জুলাই যোদ্ধারা তা প্রতিহত করবে। সংস্কারের আগে কোনো নির্বাচন হবে না।” যুগ্ম মুখ্য সংগঠক সাইফুল্লাহ হায়দার জোর দিয়ে বলেন, “বিচার না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সব রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে হবে। সংস্কারের আগে জাতীয় নির্বাচন হতে দেওয়া হবে না।”

এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা মোহাম্মদ আতাউল্লাহ অভিযোগ করে বলেন, “কয়েকটি দল এনসিপির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। যারা এনসিপির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করবে, তারা শেষ হবে। এনসিপির একজন কর্মী জীবিত থাকতে বাংলার মাটিতে আওয়ামী লীগ রাজনীতি করতে পারবে না।”

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ খালেদ সাইফুল্লাহর বাবা কামরুল হাসানও সমাবেশে বক্তব্য রাখেন। তিনি কান্নাভেজা গলায় বলেন, “আমার ছেলের বুকে ৭০টা গুলি করা হয়েছিল। একটা মানুষকে মারতে কত গুলি করতে হয়? হত্যার বিচার না হওয়া পর্যন্ত কোনো নির্বাচন হতে দেওয়া হবে না। স্বৈরাচারী ফ্যাসিবাদী হাসিনা ও তার দোসরদের এ দেশে কোনো স্থান থাকবে না।”

পাঁচটার দিকে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সমাবেশে যোগ দেন। সমাবেশে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম জনগণের কাছে দলের পরিকল্পনা ও দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “আমরা দ্রুত সুসংগঠিত হবো এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে একটি সুশৃঙ্খল দল হিসেবে জনগণের কাছে পৌঁছে যাবো। বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে ঘরে, দরজায় দরজায় গিয়ে এনসিপির বার্তা পৌঁছে দেব। আপনারা প্রস্তুত হন। জেলায় জেলায়, ইউনিয়নে ইউনিয়নে, পাড়া-মহল্লায় আমরা আসছি। দ্রুত সময়ের মধ্যে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের জন্য পাড়ায় মহল্লায় ফ্যাসিবাদবিরোধী মঞ্চ তৈরি করুন।”

তিনি আরও জানান, “আমরা জনতার আদালত তৈরি করবো। যদি এই সরকার বিচার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, আমরা বসে থাকবো না। জনতার আদালতে আওয়ামী লীগ ও ফ্যাসিজমের বিচার নিশ্চিত করা হবে।” নাহিদ ইসলাম জোর দিয়ে বলেন, “আজকে বাংলাদেশে যারা রাজনীতি করছে, ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে, তারা শহীদ পরিবার ও আহতদের আত্মত্যাগের ফলেই এই স্বপ্ন দেখতে পাচ্ছেন। ফলে অবিলম্বে জুলাই ঘোষণাপত্র দিতে হবে। আমরা যে জুলাই সনদের কথা বলছি, মৌলিক সংস্কারের ভিত্তিতে রাষ্ট্র ও শাসন ব্যবস্থা আমূল পরিবর্তন রাজনৈতিক ঐক্যমতের ভিত্তিতে কার্যকর করতে হবে। জুলাই সনদে সুস্পষ্টভাবে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের কথা থাকতে হবে।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা একটি নতুন সংবিধানের কথা বলছি। সেই নতুন সংবিধানের জন্য আগামী নির্বাচন আইনসভা ও গণপরিষদ নির্বাচন একসঙ্গে করতে হবে। দ্রুত সময়ের মধ্যে শহীদ পরিবার ও আহতদের দায়িত্ব নিতে হবে রাষ্ট্র ও সরকারকে। তাদের নাগরিক মর্যাদা ঠিক করতে হবে।”

নাহিদ ইসলাম জানান, “এনসিপি নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে, নতুন বন্দোবস্ত বিনির্মাণে সংগঠিত হয়েছে। আমরা জানি আমাদের হাতে সময় অল্প, কিন্তু দায়িত্ব অনেক। যে জাতি আমাদের উপর ৫ আগস্ট আস্থা রেখেছিল, আমরা বিশ্বাস করি আগামীতেও এনসিপির উপর জনগণ তাকিয়ে আছে, আস্থা রাখছে।”

সমাবেশে নেতা-কর্মীরা আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ ও সংস্কারের দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দিয়েছেন। এনসিপি জনগণের সমর্থন ও সহযোগিতা কামনা করছে। মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন সদস্যসচিব আখতার হোসেন, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম ও হাসনাত আবদুল্লাহসহ জ্যেষ্ঠ নেতারা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *