জাহাজ নির্মাণ চুক্তি বাতিল-newsedge24

কলকাতা-ভিত্তিক ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত জাহাজ নির্মাণ সংস্থা গার্ডেন রিচ শিপবিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড (জিআরএসই) এর সঙ্গে ২১ মিলিয়ন ডলারের (প্রায় ১৮০ কোটি টাকা) টাগবোট নির্মাণ চুক্তি বাতিল করেছে বাংলাদেশ। এই চুক্তি গত বছরের জুলাইয়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সঙ্গে স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যখন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় ছিলেন। গত বছরের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে হাসিনার পতনের পর দুই দেশের সম্পর্কের অবনতির মধ্যে এই চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত এসেছে। হিন্দুস্তান টাইমস ও অন্যান্য সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

জিআরএসই বুধবার ভারতের ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জে এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, “বাংলাদেশ সরকার এই অর্ডার বাতিল করেছে।” চুক্তিটি ভারতের ৫০০ মিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা ঋণরেখার অধীনে প্রথম বড় প্রকল্প ছিল, যা ২০২৩ সালে চালু হয়। এই প্রকল্পে ৮০০ টন ধারণক্ষমতার একটি সমুদ্রগামী টাগবোট নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল, যার দৈর্ঘ্য ৬১ মিটার, প্রস্থ ১৫.৮ মিটার এবং সর্বোচ্চ গতি পূর্ণ লোডে ১৩ নট। টাগবোটটি সমুদ্রে জাহাজ টানা, বন্দরে সহায়তা, এবং উদ্ধার ও স্যালভেজ অপারেশনের জন্য ব্যবহৃত হতো।

দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে টানাপোড়েন:
এই চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত এমন সময়ে এসেছে যখন ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্ক উত্তেজনার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত সপ্তাহে ভারত বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও ভোগ্যপণ্য আমদানির ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে, যা শুধুমাত্র কলকাতা ও নাভা শেভা সমুদ্রবন্দর দিয়ে আমদানির অনুমতি দেয়। এই নিষেধাজ্ঞা বাংলাদেশের প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি খাতকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করবে, যার ৯৩% স্থলবন্দরের মাধ্যমে ভারতে প্রবেশ করত। এছাড়া, এপ্রিল ২০২৫-এ ভারত বাংলাদেশি পণ্য ভারতীয় বিমানবন্দর ও বন্দর ব্যবহার করে তৃতীয় দেশে রপ্তানির সুবিধা বাতিল করে। জবাবে, বাংলাদেশ ১৩ এপ্রিল থেকে স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে সুতা আমদানি বন্ধ করে দেয়।

শেখ হাসিনার আমলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ছিল উষ্ণ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভারতের রপ্তানি বাংলাদেশে ছিল ১১.০৬ বিলিয়ন ডলার, আর বাংলাদেশ থেকে আমদানি ছিল ১.৮ বিলিয়ন ডলার। তবে হাসিনার পতন এবং প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর সম্পর্কের অবনতি ঘটে। ইউনূসের চীন সফরে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোকে “ভূমিবেষ্টিত” উল্লেখ করে বাংলাদেশকে সমুদ্রপথের “একমাত্র প্রহরী” বলার মন্তব্য ভারতের ক্ষোভের কারণ হয়েছে। এছাড়া, বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে ২.১ বিলিয়ন ডলারের নতুন চুক্তি করেছে, যা ভারতের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

জিআরএসই-এর সঙ্গে চুক্তিটি ২০২৪ সালের জুনে শেখ হাসিনার ভারত সফরে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে স্বাক্ষরিত হয়। এটি ভারতীয় নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল দিনেশ কে ত্রিপাঠীর বাংলাদেশ সফরের সময় চূড়ান্ত হয়। তবে হাসিনার পতনের পর দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্য বিধিনিষেধ এবং কূটনৈতিক উত্তেজনা এই চুক্তি বাতিলের পেছনে প্রধান কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।

জিআরএসই জানিয়েছে, এই চুক্তি বাতিল তাদের আর্থিক স্থিতির উপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলবে না, কারণ এটি তাদের মোট অর্ডার বুকের (২২,৬৮০ কোটি টাকা) মাত্র ০.৮%। তবে এই ঘটনা ভারত-বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রে বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এই পদক্ষেপকে ভারতের সাম্প্রতিক বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ হিসেবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, এই বাণিজ্য ও কূটনৈতিক উত্তেজনা বাংলাদেশকে চীনের দিকে আরও ঝুঁকতে প্ররোচিত করতে পারে, যা ভারতের জন্য কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করবে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে কিছু রপ্তানি মালদ্বীপের মাধ্যমে পুনর্নির্দেশিত করছে, যা ভারতীয় বন্দরের উপর নির্ভরতা কমানোর প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *