ভারতের উত্তর সীমান্তের শান্ত ও মনোরম অঞ্চল লাদাখ এখন উত্তপ্ত। পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা এবং সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের আওতায় অন্তর্ভুক্তির দাবিতে চলমান আন্দোলনের নেতা, পরিচিত শিক্ষাবিদ ও পরিবেশ কর্মী সোনম ওয়াংচুককে শুক্রবার লাদাখ পুলিশ জাতীয় নিরাপত্তা আইন (এনএসএ) এর অধীনে গ্রেপ্তার করেছে। সরকারের অভিযোগ, ওয়াংচুকের উস্কানিমূলক বক্তব্যের ফলে লেহে সহিংসতা ছড়িয়েছে, যাতে চারজন নিহত এবং ৮০-এর বেশি আহত হয়েছেন।
আন্দোলনের দুই দিন পরই এই গ্রেপ্তার ঘটেছে। বুধবার লেহে শান্তিপূর্ণ বন্ধের সময় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষে চারজন নিহত হন এবং ৯০-এর বেশি লোক আহত হন। প্রতিবাদকারীরা বিজেপি কার্যালয় এবং স্থানীয় সরকারি দপ্তরে হামলা চালায়, যা সরকার ‘হিংসাত্মক’ বলে অভিহিত করেছে। এরপরই ওয়াংচুক তার ১৫ দিনের অনশন প্রত্যাহার করে শান্তির আহ্বান জানান, কিন্তু শুক্রবার দুপুর ২:৩০-এ এক সংবাদ সম্মেলনের সময় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এর আগে বৃহস্পতিবার ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, ওয়াংচুক ‘আরব বসন্তের কায়দায়’ বিক্ষোভে উস্কানি দিয়ে নেপালের জেন জি আন্দোলনের উল্লেখ করে জনগণকে বিভ্রান্ত করেছেন। মন্ত্রণালয় জানায়, বহু নেতা তার অনশন প্রত্যাহারের আহ্বান জানালেও তিনি তা অগ্রাহ্য করেন। তার উদ্বুদ্ধকর বক্তৃতায় প্রভাবিত হয়ে একদল জনতা অনশনস্থল ত্যাগ করে সহিংসতায় যোগ দেন। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এই ঘটনা ‘রাজনৈতিকভাবে উদ্দীপ্ত’ গোষ্ঠীর কাজের ফল, যারা সরকারের সঙ্গে চলমান আলোচনা মানতে চায় না।
গ্রেপ্তারের পূর্বে সরকার ওয়াংচুকের প্রতিষ্ঠিত ‘স্টুডেন্টস এডুকেশন অ্যান্ড কালচারাল মুভমেন্ট অব লাদাখ’ (এসইসিএমওএল)-এর ফরেন কনট্রিবিউশন রেগুলেশন অ্যাক্ট (এফসিআরএ) লাইসেন্স বাতিল করে। সিবিআই তদন্তে অর্থের অপব্যবহার, বিদেশি তহবিলের অনিয়ম এবং জাতীয় স্বার্থবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগ উঠেছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২১-২২ অর্থবছরে ওয়াংচুক নিজের থেকে ৩.৩৫ লক্ষ টাকা জমা করেন, যা এফসিআরএ-এর নিয়ম লঙ্ঘন। তার আরেক প্রতিষ্ঠান হিমালয়ান ইনস্টিটিউট অব অলটারনেটিভস লাদাখও সিবিআই তদন্তের মুখোমুখি।
ওয়াংচুক ১০ সেপ্টেম্বর থেকে অনশন শুরু করেন লাদাখের জন্য রাজ্যত্ব এবং ষষ্ঠ তফসিলের সুরক্ষা দাবি করে। লেহ অ্যাপেক্স বডি এবং কর্গিল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্সের নেতৃত্বে এই আন্দোলন চলছে। গ্রেপ্তারের পর রাজনৈতিক নেতারা প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
জম্মু-কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ওমর আব্দুল্লা এটাকে ‘খুবই দুঃখজনক’ বলে অভিহিত করেছেন এবং কেন্দ্রের প্রতিশ্রুতি পূরণ না করার জন্য সমালোচনা করেছেন। কংগ্রেস নেতা রশিদ আলভি বলেছেন, ‘এটা গণতন্ত্রের পরিপন্থী, সোনমকে এনএসএ-এর অধীনে গ্রেপ্তার করে তার বেল দিতে চায় না।’ আনন্দ কেজরিওয়াল বলেছেন, ‘এটা স্বৈরশাসনের চূড়ান্ত পর্যায়।’
সামাজিক মাধ্যমে লাদাখবাসীরা এই গ্রেপ্তারের নিন্দা করেছেন। এক পোস্টে বলা হয়েছে, ‘ওয়াংচুককে কারাগারে রাখলে তার গান থামবে না, এটা লাদাখের কণ্ঠস্বরের উপর আক্রমণ।’ আরেকটিতে উল্লেখ, ‘ইন্টারনেট বন্ধ এবং কারফিউ দেখায় সরকার বার্তার ভয় পাচ্ছে।’ লাদাখবাসীরা চার নির্দোষ লোকের হত্যার জন্য ন্যায়বিচার দাবি করেছেন এবং সাংবিধানিক সুরক্ষার লড়াই চালিয়ে যাবেন বলে জানিয়েছেন।
সরকারি সূত্র জানিয়েছে, ওয়াংচুককে লাদাখ থেকে দিল্লি স্থানান্তরের ব্যবস্থা চলছে। এই ঘটনা লাদাখের আন্দোলনকে আরও জাতীয় আলোচনায় নিয়ে এসেছে, যা পরিবেশ রক্ষা এবং উপজাতীয় অধিকারের সঙ্গে জড়িত।
আরও পড়ুন: বোলসোনারোকে ক্ষমা নয়: ব্রাজিলে বিক্ষোভ
লাদাখের শিক্ষাবিদ ও পরিবেশ কর্মী সোনম ওয়াংচুকের জীবন ও কাজ বলিউডের জনপ্রিয় সিনেমা ‘থ্রি ইডিয়টস’-এর র্যাঞ্চো চরিত্রের সঙ্গে আশ্চর্যজনকভাবে মিলে যায়। র্যাঞ্চো যেমন শিক্ষার প্রচলিত ধারাকে চ্যালেঞ্জ করে উদ্ভাবনী পদ্ধতির প্রতি জোর দিয়েছিলেন, তেমনই সোনম ওয়াংচুক লাদাখের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতি ও পরিবেশ সংরক্ষণে অভূতপূর্ব অবদান রেখেছেন। তিনি শিক্ষা, পরিবেশ সচেতনতা এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য কাজ করে বিশ্বব্যাপী প্রশংসা অর্জন করেছেন।
সোনম ওয়াংচুক প্রথমে লাদাখের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতির জন্য উদ্ভাবনী পদ্ধতি প্রয়োগ করেন। তিনি ‘স্টুডেন্টস এডুকেশন অ্যান্ড কালচারাল মুভমেন্ট অব লাদাখ’ (এসইসিএমওএল) প্রতিষ্ঠা করেন, যা স্থানীয় শিক্ষার্থীদের জন্য আধুনিক ও প্রাসঙ্গিক শিক্ষার সুযোগ তৈরি করেছে। তার এই উদ্যোগ লাদাখের তরুণদের মধ্যে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বাড়িয়েছে এবং স্থানীয় সংস্কৃতি ও পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শিক্ষার মডেল গড়ে তুলেছে।



































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































