গাজায় ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রে হত্যাকাণ্ড-newsedge24

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস গাজার রাফায় ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রের কাছে ফিলিস্তিনিদের হত্যার ঘটনায় স্বাধীন ও দ্রুত তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন। গত রোববার (১ জুন) গাজার দক্ষিণাঞ্চলের রাফায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সমর্থিত গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচএফ) পরিচালিত একটি ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রের কাছে এই ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, ইসরায়েলি বাহিনী ত্রাণের জন্য অপেক্ষারত ভিড়ের ওপর গুলি চালিয়েছে।

হামাস পরিচালিত গাজার বেসামরিক নিরাপত্তা সংস্থা জানিয়েছে, ইসরায়েলি গুলিতে কমপক্ষে ৩১ জন নিহত এবং ১৭৬ জন আহত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক রেড ক্রস (আইসিআরসি) জানায়, রাফার তাদের ফিল্ড হাসপাতালে ১৭৯ জন হতাহতকে আনা হয়, যাদের মধ্যে ২১ জন মৃত অবস্থায় পৌঁছান। বেশিরভাগ আহতদের গুলি ও শ্রাপনেলের আঘাতে গুরুতর জখম হয়েছে। মেডেসিন সান ফ্রন্টিয়ার্স (এমএসএফ) জানায়, খান ইউনিসের নাসের হাসপাতালে তাদের দল গুরুতর আহত রোগীদের চিকিৎসা দিয়েছে, যারা জানিয়েছে, ইসরায়েলি ড্রোন, হেলিকপ্টার, ট্যাংক ও সৈন্যদের গুলিতে তারা আক্রান্ত হয়েছে।

রাফার স্থানীয় সাংবাদিক মোহাম্মদ ঘারিব বিবিসিকে জানান, ভোর সাড়ে ৪টার দিকে আল-আলাম রাউন্ডঅবাউটের কাছে ত্রাণ কেন্দ্রের কাছে ভিড় জমায় ফিলিস্তিনিরা। এ সময় ইসরায়েলি ট্যাংক এগিয়ে এসে গুলি চালায়। অনলাইনে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে বালুকাময় এলাকায় ফিলিস্তিনিদের আশ্রয় নিতে দেখা গেছে, যেখানে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গুলির শব্দ শোনা যায়। তবে, ভিডিওটির অবস্থান যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, তাদের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, ত্রাণ কেন্দ্রের কাছে বা ভেতরে কোনো বেসামরিক লোকের ওপর গুলি চালানো হয়নি। আইডিএফ জানায়, তারা সাইট থেকে প্রায় ১ কিলোমিটার দূরে কয়েকজন সন্দেহভাজনের দিকে সতর্কতামূলক গুলি চালিয়েছিল। জিএইচএফ অভিযোগকে “সম্পূর্ণ মিথ্যা” আখ্যা দিয়ে বলেছে, তাদের কেন্দ্রে বা আশপাশে হামলার কোনো প্রমাণ নেই। তারা দাবি করেছে, হামাস এই ঘটনা নিয়ে “মিথ্যা গুজব” ছড়াচ্ছে। ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গুতেরেসের বিবৃতিকে “অপমানজনক” বলে সমালোচনা করেছে এবং হামাসের উল্লেখ না করায় তার প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।

আন্তোনিও গুতেরেস সোমবার এক বিবৃতিতে বলেন, “ফিলিস্তিনিদের খাবারের জন্য জীবনের ঝুঁকি নেওয়া অগ্রহণযোগ্য।” তিনি ঘটনার জন্য কাউকে দায়ী না করে স্বাধীন তদন্ত এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার আহ্বান জানান। তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী ইসরায়েলের গাজায় ত্রাণ প্রবেশের সুবিধা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ফলকার টুর্ক বিবিসিকে বলেন, বর্তমানে ত্রাণ বিতরণের পদ্ধতি “অগ্রহণযোগ্য” এবং “অমানবিক”। তিনি বলেন, “যারা তিন মাস ধরে খাবার ও ওষুধের জন্য মরিয়া, তাদের এভাবে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে ত্রাণ নিতে হচ্ছে, এটি মানুষের প্রতি সম্পূর্ণ উপেক্ষার প্রকাশ।”

গাজায় প্রায় ২০ মাসের যুদ্ধ এবং তিন মাসের প্রায় সম্পূর্ণ ত্রাণ অবরোধের কারণে ২০ লাখের বেশি মানুষ দুর্ভিক্ষের ঝুঁকিতে রয়েছে। ইসরায়েল গত মার্চ থেকে ত্রাণ প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, যদিও সম্প্রতি সীমিত পরিমাণে শিশুখাদ্য, ময়দা ও ওষুধ প্রবেশের অনুমতি দিয়েছে। জাতিসংঘ বারবার গাজায় অবাধ ত্রাণ প্রবেশের জন্য অবরোধ তুলে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

ইসরায়েল ৭ অক্টোবর ২০২৩-এ হামাসের হামলার পর গাজায় সামরিক অভিযান শুরু করে, যাতে প্রায় ১,২০০ মানুষ নিহত এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়। হামাস পরিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এরপর থেকে গাজায় ৫৪,৪৭০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *