জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান সংঘাত নিয়ে তীব্র বিতর্কে পরিণত হয়। দুই দেশ ও তাদের মিত্ররা পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধের দায় চাপিয়েছে, কিন্তু সংকটের কূটনৈতিক সমাধানে কোনো ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। বৈঠকে উত্তেজনা প্রশমন ও কূটনীতির প্রতি জোর দেওয়া হলেও, দায় নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগে আলোচনা আটকে যায়।
গত সপ্তাহে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সবচেয়ে তীব্র সরাসরি সংঘাত শুরু হয়, যা দশকের পর দশক ধরে সীমিত পরিসরে ও ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে চলছিল। ইসরায়েলের দাবি, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে, যা তাদের জন্য অস্তিত্বের হুমকি। ফলে, আত্মরক্ষার জন্য ইসরায়েল ১৩ জুন থেকে ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনায় বিমান হামলা শুরু করে। জবাবে, ইরান ইসরায়েলে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়, যা এখনো চলমান।
ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৯ জুন পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় ইরানে ২২৪ জন নিহত ও ২,৫০০-এর বেশি আহত হয়েছেন। ইসরায়েলের দাবি, ইরানের হামলায় ২৯ জন নিহত ও প্রায় ৯০০ জন আহত হয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই সাধারণ নাগরিক।
ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির সাঈদ ইরাভানি ইসরায়েলের হামলাকে “যুদ্ধের ঘোষণা” ও “আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন” বলে নিন্দা করেন। তিনি ইসরায়েলকে “সন্ত্রাসী রাষ্ট্র” আখ্যা দিয়ে নিরপরাধ মানুষ হত্যা ও সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের অভিযোগ আনেন। ইরাভানি হামলায় নিহত শিশুদের ছবি তুলে ধরে ইসরায়েল ও তার মিত্র, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রকে “সহযোগী” হিসেবে দায়ী করেন। তিনি ইরানের “আত্মরক্ষার অধিকার” জোরালোভাবে তুলে ধরেন।
ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যানন হামলাকে “জাতীয় সংরক্ষণের কাজ” হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য “কয়েক দিনের মধ্যে পর্যাপ্ত ফিসাইল উপাদান” তৈরি করতে পারত। তিনি ইরানকে “ভুক্তভোগী সেজে নাটক করা” এবং “গণহত্যার পরিকল্পনা” করার অভিযোগ আনেন। ড্যানন দাবি করেন, ইরান ইচ্ছাকৃতভাবে কূটনৈতিক আলোচনায় বিলম্ব করছে।
যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধি ডরোথি ক্যামিল শে ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যে “অস্থিরতা ও সন্ত্রাসের প্রধান উৎস” হিসেবে চিহ্নিত করে ইসরায়েলের পাশে থাকার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি ইরানকে কূটনৈতিক আলোচনায় ফিরে আসার আহ্বান জানান।
রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ভ্যাসিলি নেবেনজিয়া ইসরায়েলের হামলাকে “অন্যায়” ও “আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন” বলে নিন্দা করেন। তিনি পশ্চিমা দেশগুলোর দাবিকে “ভিত্তিহীন গুজব” হিসেবে উড়িয়ে দিয়ে আইএইএর প্রতিবেদনকে “পক্ষপাতদুষ্ট” বলেন।
চায়না প্রতিনিধি ফু কং ইসরায়েলের হামলার নিন্দা করে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি ও কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানান। তিনি পারমাণবিক আলোচনায় বাধা সৃষ্টির জন্য ইসরায়েলের সমালোচনা করেন, তবে যুক্তরাষ্ট্র বা আইএইএর বিরুদ্ধে সরাসরি কিছু বলেননি।
যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স উভয় দেশই সংযত ভঙ্গিতে উত্তেজনা প্রশমন ও কূটনীতির ওপর জোর দেন।
১২ জুন আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) জানায়, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) লঙ্ঘন করেছে। সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরির উপযোগী মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করছে, যা শুধু পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশগুলোর ক্ষেত্রেই দেখা যায়। তবে, ইরান সরাসরি পারমাণবিক বোমা তৈরি করছে, এমন কোনো দাবি প্রতিবেদনে নেই।
ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা নাটানজ, ফোর্দো ও ইসফাহানে ইসরায়েলি হামলায় উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে। আইএইএর প্রধান রাফায়েল গ্রসি নিরাপত্তা পরিষদে বলেন, পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা “গুরুতর ঝুঁকি” সৃষ্টি করতে পারে এবং এটি কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়।
জেনেভায় ইরান ও ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে চলমান পারমাণবিক আলোচনা অগ্রগতি ছাড়াই মুলতবি হয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানান, ইসরায়েল হামলা বন্ধ না করলে গঠনমূলক আলোচনা সম্ভব নয়।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করে বলেন, “আমরা শুধু সংকটের দিকে এগোচ্ছি না, আমরা সেদিকে ছুটে চলেছি।” তিনি ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির অভিযোগে “আস্থার ফাঁক” উল্লেখ করে কূটনৈতিক সমাধান ও আইএইএর পরিদর্শকদের পূর্ণ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
মার্কিন প্রতিনিধি ম্যাককয় পিট জানান, ইসরায়েল আগাম তথ্য দিলেও যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি হামলায় জড়িত ছিল না। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে ৬০ দিনের আলটিমেটাম দিয়েছিলেন, যা ১২ জুন শেষ হয়। তিনি ইঙ্গিত দেন, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক হস্তক্ষেপের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
ইরাক, কুয়েত ও ওমান ইসরায়েলের হামলার নিন্দা করে এটিকে সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হিসেবে বর্ণনা করে। ইরাক ইসরায়েলের বিমান ইরাকি আকাশসীমা ব্যবহার করায় নিরাপত্তা পরিষদে অভিযোগ দায়ের করে।
ইরান-ইসরায়েল সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যে বৃহত্তর সংঘর্ষের ঝুঁকি তৈরি করেছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক সংকট সমাধানে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে, কারণ সদস্যরা দায় নিয়ে বিভক্ত। কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান সত্ত্বেও, চলমান হামলা ও পারস্পরিক অভিযোগ আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পারমাণবিক ঝুঁকি ও বেসামরিক হতাহতের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা বিশ্ব সম্প্রদায়ের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।



































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































