ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সাত বছর পর চীন সফরে গিয়ে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেছেন। এই বৈঠকটি তিয়ানজিন শহরে সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও) সম্মেলনের সাইডলাইনে ৩১ আগস্ট ২০২৫ তারিখে অনুষ্ঠিত হয়। মোদি ৩০ আগস্ট ২০২৫-এ সম্মেলনে যোগ দিতে চীনে পৌঁছান। এই সফরে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও উপস্থিত ছিলেন। এটি মোদি ও শির মধ্যে প্রায় ১০ মাস পর প্রথম দ্বিপাক্ষিক বৈঠক, যিনি এর আগে ২০২৪ সালের অক্টোবরে রাশিয়ার কাজানে ব্রিকস সম্মেলনের সাইডলাইনে মিলিত হয়েছিলেন।
২০২০ সালের গালওয়ান উপত্যকায় ভারত ও চীনের সেনাদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর দুই দেশের সম্পর্কে তিক্ততা দেখা দেয়। এই ঘটনার পর থেকে উভয় দেশের মধ্যে উত্তেজনা চলছিল, বিশেষ করে সীমান্ত বিরোধ নিয়ে। তবে, ২০২৪ সালে কাজানে ব্রিকস সম্মেলনের পর থেকে সম্পর্কের উন্নতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে দুই দেশের মধ্যে চুক্তি হয়েছে, যার মধ্যে প্যাট্রোলিং ব্যবস্থাপনা এবং সীমান্তে উত্তেজনা হ্রাসের বিষয়টি উল্লেখযোগ্য।
মোদি তাঁর বৈঠকে বলেন, “কাজানে আমাদের ফলপ্রসূ আলোচনার পর সীমান্তে বিচ্ছিন্নকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শান্তি ও স্থিতিশীলতার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।” তিনি আরও জানান, ভারত ও চীনের মধ্যে সরাসরি ফ্লাইট পুনরায় চালু করা হচ্ছে এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে পারস্পরিক সম্মান, বিশ্বাস এবং সংবেদনশীলতার ভিত্তিতে এগিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ভারতের রাশিয়া থেকে তেল আমদানির কারণে ভারতীয় পণ্যের ওপর ৫০% শুল্ক আরোপ করেছেন। এই শুল্কনীতি ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে টানাপোড়েন সৃষ্টি করেছে। এই প্রেক্ষাপটে ভারত ও চীনের মধ্যে সম্পর্কের উন্নতি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। বহু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ট্রাম্পের শুল্কনীতি ভারত ও চীনকে একে অপরের কাছে টেনে এনেছে, যা যুক্তরাষ্ট্র বছরের পর বছর ধরে ঠেকানোর চেষ্টা করছিল।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বলেন, “তিয়ানজিন সম্মেলন এসসিও’র ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সম্মেলন হবে। এটি ঐক্য, বন্ধুত্ব এবং ফলপ্রসূ ফলাফলের একটি সমাবেশ হবে।” তিনি আরও বলেন, চীন এই সম্মেলনের মাধ্যমে এসসিও’র উন্নয়নে নতুন পদক্ষেপ ঘোষণা করবে।
বৈঠকের উদ্দেশ্য ও প্রত্যাশা
মোদি ও শির মধ্যে এই বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, এবং সীমান্তে শান্তি বজায় রাখার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। মোদি বলেন, “ভারত ও চীনের মতো দুটি বৃহৎ অর্থনীতির দেশের সহযোগিতা বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।” তিনি উল্লেখ করেন যে, দুই দেশের ২.৮ বিলিয়ন মানুষের স্বার্থ এবং বিশ্বের কল্যাণের জন্য সহযোগিতা প্রয়োজন।
শি জিনপিং তাঁর বক্তব্যে বলেন, “বিশ্ব পরিবর্তনের দিকে এগোচ্ছে। ভারত ও চীন দুটি প্রাচীন সভ্যতা এবং বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দুটি দেশ। আমাদের বন্ধুত্ব এবং ‘ড্রাগন ও হাতির একসঙ্গে নাচ’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।” তিনি এই বৈঠককে দুই দেশের সম্পর্কের নতুন সূচনা হিসেবে উল্লেখ করেন।
আরও পড়ুন: ইসরাইলের জন্য আকাশসীমা ও বাণিজ্য বন্ধ ঘোষণা তুরস্কের
২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত এসসিও বর্তমানে ১০টি স্থায়ী সদস্য এবং ১৬টি পর্যবেক্ষক ও সংলাপ-ভিত্তিক দেশ নিয়ে বিশ্বের বৃহত্তম আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর একটি। এই সম্মেলনে ২০টিরও বেশি দেশের নেতা এবং জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস উপস্থিত ছিলেন। চীন এই বছর এসসিও’র সভাপতিত্ব করছে এবং সম্মেলনের মাধ্যমে বৈশ্বিক দক্ষিণের ঐক্য এবং বহুপাক্ষিকতার বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছে।
ভারত এসসিও’র মাধ্যমে বাণিজ্য, সংযোগ, এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ওপর জোর দিয়েছে। তবে, বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ভূ-রাজনৈতিক পার্থক্যের কারণে উল্লেখযোগ্য নীতিগত অগ্রগতি সীমিত থাকতে পারে।



































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































