শুক্রবার (১৩ জুন ২০২৫) ভোরে ইসরায়েলের ‘অপারেশন রাইজিং লায়ন’ নামে পরিচালিত বিমান হামলায় ইরানের সামরিক ও বেসামরিক ক্ষেত্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা নিহত হন। এই হামলায় ইরানের সশস্ত্র বাহিনী ও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর শীর্ষ নেতৃত্বের উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়। তবে ইরান দ্রুত নতুন কমান্ডার নিয়োগের মাধ্যমে শূন্যতা পূরণ করেছে। এই পরিবর্তনের ফলে ইরান-ইসরায়েল সংঘাত নতুন মাত্রা পেতে পারে।
ইসরায়েলি হামলায় নিহত সামরিক ও বেসামরিক নেতা
ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সামরিক বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের বেশ কয়েকজন নেতা নিহত হন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
- মেজর জেনারেল মোহাম্মদ বাঘেরি: ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান। তিনি ১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন এবং সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা খামেনির অধীনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন। তিনি ইরানের সামরিক কৌশল নির্ধারণে কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন।
- মেজর জেনারেল হোসেইন সালামি: আইআরজিসির কমান্ডার-ইন-চিফ। ২০১৯ সাল থেকে তিনি এই পদে ছিলেন এবং ইরানের পরমাণু ও আঞ্চলিক সামরিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর বক্তব্যের জন্য পরিচিত ছিলেন।
- মেজর জেনারেল গোলাম আলী রাশিদ: খাতাম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টারের কমান্ডার। তিনি ইরানের সামরিক কার্যক্রমের সমন্বয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতেন।
- ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমির আলী হাজিজাদেহ: আইআরজিসির মহাকাশ বিভাগের প্রধান। তিনি ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তির উন্নয়নে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তেহরানের একটি ভূগর্ভস্থ বাংকারে বৈঠকের সময় তিনি ও মহাকাশ বিভাগের আরও সাতজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিহত হন।
- মেহেদি রাবানি: সশস্ত্র বাহিনীর অপারেশনস বিভাগের উপপ্রধান। তিনি সামরিক অভিযান পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন।
- গোলামরেজা মেহরাবি: সশস্ত্র বাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগের উপপ্রধান। তিনি ইরানের সামরিক গোয়েন্দা কার্যক্রমের অন্যতম নেতা ছিলেন।
- পরমাণু বিজ্ঞানীরা: অন্তত ছয়জন পরমাণু বিজ্ঞানী নিহত হন, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মোহাম্মদ-মেহদি তাহরাঞ্চি (ইসলামিক আজাদ ইউনিভার্সিটির প্রেসিডেন্ট) এবং ফেরাইদুন আব্বাসি (ইরানের পারমাণবিক শক্তি সংস্থার সাবেক প্রধান)।
ইসরায়েলের হামলায় তেহরান, নাতানজ ও ইস্ফাহানের পারমাণবিক স্থাপনা, সামরিক ঘাঁটি এবং আইআরজিসির সদর দপ্তর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া বেসামরিক এলাকায় হামলায় নারী ও শিশুসহ অনেকে নিহত হন, যার সংখ্যা ২২০-এর বেশি বলে ইরান জানিয়েছে।
নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত কমান্ডার
ইরান দ্রুত নতুন কমান্ডার নিয়োগের মাধ্যমে সামরিক নেতৃত্ব পুনর্গঠন করেছে। নতুন নিয়োগপ্রাপ্তরা হলেন:
- ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদোলরহিম মোসাভি: সশস্ত্র বাহিনীর নতুন প্রধান। তিনি ইরানের সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর সামরিক প্রশিক্ষণ নেন। তিনি ইরান-ইরাক যুদ্ধে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন এবং সশস্ত্র বাহিনীর প্রথম সেনা সদস্য হিসেবে এই পদে নিয়োগ পান, যা আগে আইআরজিসির সদস্যদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল।
- মোহাম্মদ পাকপুর: আইআরজিসির নতুন প্রধান। তিনি ১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধে সাঁজোয়া ইউনিট ও যোদ্ধা ডিভিশনের নেতৃত্ব দেন এবং ১৬ বছর ধরে আইআরজিসির স্থলবাহিনীর কমান্ডার ছিলেন। তিনি আঞ্চলিক সামরিক কার্যক্রমে অভিজ্ঞ।
- মেজর জেনারেল আমির হাতামি: সেনাবাহিনীর নতুন কমান্ডার। তিনি ইরান-ইরাক যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং সামরিক কৌশলে অভিজ্ঞ। তাকে সম্প্রতি মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।
- ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাজিদ মোসাভি: আইআরজিসির মহাকাশ বিভাগের নতুন প্রধান। তিনি ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন প্রযুক্তি ও মহাকাশ উৎক্ষেপণ কর্মসূচিতে কাজ করেছেন। তিনি হাসান তেহরানি মোগাদ্দামের সঙ্গে কাজ করেছেন, যিনি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির পথপ্রদর্শক হিসেবে পরিচিত।
ইরান ইতিমধ্যে ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ থ্রি’ নামে শতাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে ইসরায়েলের তেল আবিব, জেরুজালেম ও সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। এতে ১৪ জন নিহত ও বহু মানুষ আহত হয়েছেন। রোববার (১৬ জুন) ইসরায়েলের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা ইরানের প্রতিশোধমূলক মনোভাব প্রকাশ করে।
নতুন কমান্ডাররা অভিজ্ঞ হলেও, তাদের দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সমন্বয় ক্ষমতা পরীক্ষিত হবে। মোহাম্মদ পাকপুর ও মাজিদ মোসাভির নেতৃত্বে আইআরজিসি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ওপর জোর দিতে পারে। আবদোলরহিম মোসাভি সেনাবাহিনী ও আইআরজিসির মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে চেষ্টা করতে পারেন।
এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা বাড়াচ্ছে। সৌদি আরব, তুরস্ক ও কাতার সংযমের আহ্বান জানালেও তেলের দাম ৭% বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এই হামলায় জড়িত নয় বলে জানালেও ইরানকে সতর্ক করেছে, যা বৃহত্তর সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি করছে।
ইসরায়েলের হামলায় নাতানজ ও ইস্ফাহানের পারমাণবিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ইচ্ছা নেই বলে জানিয়েছেন। তবে এই হামলা ইরানকে আলোচনা থেকে সরে আসতে বাধ্য করতে পারে।
ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সামরিক নেতৃত্বের বড় ক্ষতি হলেও নতুন কমান্ডারদের দ্রুত নিয়োগ ইরানের সাংগঠনিক সক্ষমতা প্রকাশ করে। তবে এই সংঘাত একটি পূর্ণমাত্রার আঞ্চলিক যুদ্ধের দিকে যেতে পারে, যা তেলের বাজার, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করবে।














































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































